জিনিয়াসে বিক্রি হলেও ডিম সরবরাহ করেছে সিপি। থাইল্যান্ডভিত্তিক এই বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ভোক্তাকে ঠকানো এবং দেশের পোল্ট্রি বাজার অস্থিতিশীল করার অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে আছে। মিথ্যা ঘোষণা প্রদর্শন করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর, কোম্পানি ইতিমধ্যে ডিম, মুরগি, মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধসহ পোল্ট্রি শিল্পের বাজারের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
১৯৭৮ সালে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে ব্যবসা শুরু করা সিপি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, ‘কিচেন অব বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে। কোম্পানির শীর্ষ দুই পদের কোনো পদেই বাংলাদেশি নেই। মি. সুকাত শান্তিপদ প্রেসিডেন্ট এবং প্রিদা চুনং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমে বাংলাদেশের একটি কোম্পানির সঙ্গে ৫১:৪৯ শেয়ারে ব্যবসা শুরু করলেও কয়েক বছরের মধ্যে তারা স্থানীয় পার্টনারকে সরিয়ে দিয়ে পুরো মালিকানা নিজেদের নামে নিয়েছে। তাদের ফুডশপগুলোতে ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং ভ্যাট চালান না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সারাদেশে সিপি-এর তিন শতাধিক ফুড আউটলেট রয়েছে। ঢাকা শহরের প্রধান রাস্তাগুলোতে এবং অলিতে-গলিতে সহজেই চোখে পড়ে তাদের আউটলেট। ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মূসক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এমন তিনটি আউটলেটে অভিযান চালায়। অভিযোগ যাচাই করতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সিপি-এর হিসাব সংক্রান্ত কাগজপত্র ও তথ্য-উপাত্ত জব্দ করে। তখনই ধরা পড়ে, ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকার সাভার ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর এবং চট্টগ্রামে তাদের ফিড মিল ছাড়াও হ্যাচারি এবং ব্রয়লার ও লেয়ার ফার্ম রয়েছে। উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতার কারণে পোল্ট্রি ফিড ও ফুডের মূল্য নির্ধারণে তারা স্বতঃস্ফূর্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে দেশের বহু ক্ষুদ্র খামারি বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের সঙ্গে সিপি’র ব্রয়লার মুরগি পালন ও বাজারজাতকরণের চুক্তি নেই বলেও দাবি দেশি খামারিদের। দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে ‘পোল্ট্রি জায়ান্ট’ হিসেবে পরিচিত এ কোম্পানির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্থানীয় উদ্যোক্তারা। কৃত্রিম উপায়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে ভিয়েতনাম সরকার সিপি’র বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরু করে। অবৈধভাবে সিপি’র ব্রয়লার মুরগি পালন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের মে মাসে মানববন্ধন করে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার প্রায় দেড় হাজার খামারি। তবে সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পোল্ট্রির সব সেক্টরে একচেটিয়া ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে সিপি। একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন থেকে শুরু করে ফিড ও ফিডের প্রিমিং তৈরি, ডিম ও মাংস উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পোল্ট্রি ওষুধ ও ভ্যাকসিন আমদানি করে বাজারজাত শুরু করে তারা।
সিপি-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা দেশের ক্ষুদ্র খামারিদের বাজার থেকে বের করে দিতে প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। বিপুল পুঁজির কারণে হঠাৎ উৎপাদন কমিয়ে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে, ডিম, মুরগি ও মুরগির বাচ্চার দাম বাড়িয়ে মুনাফা অর্জন করছে। আবার সুযোগ বুঝে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশি খামারিদের সমস্যায় ফেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা প্রথম পোল্ট্রি খামার এগ অ্যান্ড হেনস লিমিটেড কিনে নেয় সিপি। কোম্পানিটি প্রথম ব্যবসা শুরু করে গাজীপুর-শ্রীপুরের জয়না বাজারে রফিজউদ্দিনের খামার ভাড়া নিয়ে। মাত্র ৬৬ হাজার টাকায় ৫ বছরের জন্য এই খামার ভাড়া নেয় তারা। চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় রফিজউদ্দিনকে। এমন কূটকৌশলী ও মুনাফালোভী কর্মকাণ্ডের কারণে পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট মহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
