সানি শুল্ককরের ১৯২ কোটি টাকা মেরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়েছেন

ক্রোনি গ্রুপের বন্ড সুবিধার অপব্যবহার

** প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার পরও ১১০ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে
** অবন্তি কালার, ক্রোনি অ্যাপারেল, ক্রোনি টেক্স সুয়েটার বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদন না করে বিক্রি করে দিয়েছে
** ফাঁকি দেওয়া শুল্ককরের টাকা ও ব্যাংকের টাকা নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম সানি সিঙ্গাপুর পালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে
** ক্রোনি অ্যাপারেল ও অবন্তি কালার রূপালী ব্যাংকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি
** রূপালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ও বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের ডিএমডি পারসুমা আলম শামীম ওসমানের ছত্রছাত্রায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা ছাড়াই ঋণ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে

নারায়নগঞ্জে সাবেক আওয়ামীলীগ নেতা ও সিআইপির দুইটি প্রতিষ্ঠান। সেজন্য কাস্টমস আইনকে থোড়াই কেয়ার করা হয়েছে। বন্ড বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাপড় ও সুতা আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু সেই সুতা দিয়ে কাপড় তৈরি হয়নি। আমদানি করা কাপড় দিয়েও পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করা হয়নি। বন্ড সুবিধার সেই কাপড় ও সুতা সব খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এক, দুই বছর নয়-অন্তত কয়েক বছর ধরে এই অনিয়ম করা হয়েছে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুল্ককরও পরিশোধ করা হয়নি। বন্ড কমিশনারেট অনেকটা জেনেও অজানা কারণে চুপ ছিলো।

এমনকি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার পরও প্রায় একবছর পর‌্যন্ত কাপড় আমদানি হয়েছে। কিন্তু সেই কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। দুইটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ড সুবিধার সুতা ও কাপড় আমদানির উপর প্রায় ১৯২ কোটি ২৩ লাখ টাকার শুল্ককর বকেয়া রয়েছে। সেই আ.লীগ নেতা (নরসিংদী-৪) ও বিকেএমই’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি এএইচ আসলাম সানী। তার প্রতিষ্ঠান দুইটি হলো-ক্রোনি গ্রুপের অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেড ও ক্রোনি অ্যাপারেলস লিমিটেড। শুল্ককর আদায়ে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ২০২৩ সাল থেকে কয়েকবার দাবিনামা জারি করলেও টাকা জমা দেওয়া হয়নি। শুধু বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নয়, দুইটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রূপালী ব্যাংকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপির অভিযোগ রয়েছে। শুল্ককরের প্রায় ১৯২ কোটি টাকা ও রূপালী ব্যাংকের প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে সানি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
Crony Sani

সূত্রমতে, এএইচ আসলাম সানী ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি, বিকেএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি সিআইপিও নির্বাচিত হয়েছেন। আ.লীগের সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি নরসিংদী-৪ (বেলাব-মনোহরদী) আসনে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। তিনি ক্রোনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেড একটি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত। এটি ক্রোনি গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং প্রধানত নিট পোশাক রপ্তানি করতেন। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। এছাড়া একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ক্রোনি অ্যাপারেলস লিমিটেড শতভাগ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং একই জায়গায় অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সালে বন্ড লাইসেন্স পায়।

এনবিআর সূত্রমতে, দুইটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা ও কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ালী লীগের সময় কোন প্রকার সুতা ও কাপড় দিয়ে পণ্য তৈরি এবং রপ্তানি করা হতো না। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমদানি করা সুতা ও কাপড় শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী, অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেড ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর‌্যন্ত পাঁচ বছরে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬১৭ কেজি বা ১৪ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন কাপড় ও সুতা আমদানি করেছে। যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৪৪০ কোটি ৬৯ লাখ ২১ হাজার ৭৭০ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ২১০ কোটি ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৯০২ টাকা।

একাধিক সূত্র বলছে, দুইটি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অ্যাসাইকুডার হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর‌্যন্ত অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেডের নামে বন্ড সুবিধায় কাপড় ও সুতা আমদানি করা হয়েছে। সেই কাপড় ও সুতার হদিস পাননি বন্ড কমিশনারেট। এমনকি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে কাটিং তদারকি দিয়ে কাপড় খালাস করা হয়েছে। কিন্তু কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ পেয়েছেন। পরে প্রতিষ্ঠান খুলে তাতে বন্ড সুবিধার কাপড় খুঁজে পাননি। অর্থাৎ আমদানি করা এসব কাপড় শুল্ককর ফাঁকি দিতে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
Crony Group Hosna
ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে, অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেডের ২০১৯ সালের ১৮ জুন থেকে ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর পর‌্যন্ত নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে স্থানীয় বাজার থেকে ইউডি বর্হিভূত ১ কোটি ১০ লাখ ৭ হাজার ৬২৫ ডলার মূল্যের কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে, যার শুল্কারোপযোগ্য মূল্য ৩৮ কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার ৯০৫ টাকা। যাতে প্রযোজ্য মূসক ৫ কোটি ৭১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৬ টাকা। এই টাকা পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর দাবিনামা জারি করে বন্ড কমিশনারেট। ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর পর‌্যন্ত ১৭ লাখ ৬ হাজার ৩০৭ কেজি সুতা আমদানি করে বিক্রি করে দিয়েছে। এছাড়া ৪ লাখ ৬ হাজার ৩২৭ কেজি সুতা অতিরিক্ত ব্যবহার করেছে। এতে মোট ৫ কোটি ৫১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬১ টাকা শুল্ককর ও মূসক পরিশোধযোগ্য। বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এসময় বন্ড সুবিধার লবণ ও কেমিক্যাল পায়নি, যাতে ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৩৭৮ টাকা শুল্ককর ফাঁকি পেয়েছে। এছাড়া ৪০ লাখ ৭৫ হাজার ২০৪ টাকার এক্সেসরিজ পায়নি, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ৫৩ লাখ ৫ হাজার ৭১১ টাকা। আবার অননুমোদিত এইচএস কোড ব্যবহার করে কাপড় আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৭২ লাখ ৮৪ হাজার ৪৬৪ টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা কাপড় ও এক্সেসরিজের বেশিরভাগ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বন্ড কমিশনারেটের হিসাব অনুযায়ী খোলাবাজারে বিক্রি করা কাপড় ও এক্সেসরিজ পণ্যের উপর প্রতিষ্ঠানটি মোট ১১৫ কোটি ৫৪ লাখ ৭০ হাজার ২৩ টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে। এই শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি পৃথকভাবে একাধিকবার দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোন জবাব দেয়নি বা শুল্ককর পরিশোধ করেনি। তবে, বন্ড কমিশনারেটের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি কিছু পণ্য রপ্তানি দেখিয়েছে। যাতে গরমিল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ রপ্তানি ভুয়া বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

অপরদিকে, একই গ্রুপের ক্রোন্তি অ্যাপারেলস লিমিটেড একইভাবে আমদানি করা বেশিরভাগ কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ক্ষমতাধর হওয়ায় কাস্টমস আইনকে তোয়াক্কা করতেন না। প্রতিবছর নিরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও নিরীক্ষা করতেন না। এই প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি করে দেওয়া কাপড়ের উপর শুল্ককর ফাঁকি হয়েছে ৭১ কোটি ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ২১৬ টাকা। এই শুল্ককর পরিশোধেও প্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে একাধিকবার দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। কিন্তু কোন জবাব বা শুল্ককর পরিশোধ করা হয়নি।

অবন্তি কালার ও ক্রোনি অ্যাপারেলস টেক্স বন্ধ, ১১০ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি হলো কিভাবে

কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবন্তি কালার টেক্স লিমিটেড ২০২৫ সালের নভেম্বর পর‌্যন্ত সুতা, কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি করেছে। অথচ ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুইটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তাহলে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে কিভাবে কাঁচামাল আমদানি হলেও-এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্ালয় অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে চারটি বিল অব এন্ট্রিতে আমদানি মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৭৫৯ কেজি বা ১১০ দশমিক ৭৫৯ মেট্রিক টন কাপড় আটক করে। পরে কাটিং তদারকির শর্তে খালাস দেওয়া হয়। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখতে পান যে প্রতিষ্ঠান বন্ধ। পরে কর্মাশিয়াল কর্মকর্তার সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। খুলে দেখা যায়, তাতে কোনো কাঁচামাল নেই। প্রতিষ্ঠানটি এই কাঁচামাল বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ৫ কোটি ৪২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৮২ টাকা। এই শুল্ককর আদায়ে কাস্টমস গোয়েন্দা বন্ড কমিশনারেটকে প্রতিবেদন দিয়েছে। আসলাম সানির দুইটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া মোট শুল্ককরের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯২ কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ১২১ টাকা। শুধু শুল্ককর ফাঁকি নয়, অভিযোগ রয়েছে আসলাম সানি শামীম ওসমানের সহায়তায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং রূপালি ব্যাংকের ডিএমডি পারসুমা আলমের সহায়তায় এই দুইটি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে অবৈধভাবে প্রায় ৭-৮শ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আবার কিছু পণ্য রপ্তানি করলেও টাকা দেশে আসেনি। আসলাম সানি টাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে ক্রোনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচ আসলাম সানিকে ফোন দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে বক্তব্যের বিষয় লিখে দিলেও তিনি জবাব দেননি। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রুপের চেয়ারম্যান নীলা হোসনে আরাকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভি করেননি। বক্তব্যের বিষয় লিখে দেওয়া হলে তিনি সিন করেন। তবে কোন জবাব দেননি।

এই বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজনেস বার্তাকে বলেন, ক্রোনি গ্রুপের দুইটি প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে। কোন ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে না। প্রতিষ্ঠানটির পরতে পরতে অনিয়ম। বন্ড কমিশনারেট নিরীক্ষা ছাড়া প্রতিষ্ঠানকে ধরার উপায় থাকে না। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো সুতা, কাপড় আমদানির সময় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সঠিকভাবে যাচাই ও তদারকি করলে এই অনিয়ম করার সুযোগ পেতো না। আমরা বারবার চেষ্টা করেও ফাঁকি দেওয়া টাকা আদায় করতে পারিনি।

** ১০.১২ কোটি টাকার গ্যাস চুরি, সানির বিরুদ্ধে মামলা