দেশের পুঁজিবাজারে সাতটি ব্রোকারেজ হাউস ভুয়া ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারসহ নানা কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৬০ কোটির বেশি টাকা ও শেয়ার আত্মসাৎ করেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংঘটিত এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে। তদন্তে দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত প্রযুক্তি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের অজান্তে শেয়ার বিক্রি, হিসাব গোপন এবং অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
ডিএসইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসাতের অভিযোগে শীর্ষে রয়েছে মশিউর সিকিউরিটিজ—প্রায় ১৬১ কোটি টাকা। এরপর তামহা সিকিউরিটিজে ১৩৯ কোটি ৭০ লাখ, সালতা ক্যাপিটালে ১০০ কোটি ৫২ লাখ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজে প্রায় ৮০ কোটি (নিরীক্ষা অনুযায়ী ১০৫ কোটি), বাংকো সিকিউরিটিজে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজে ১৩ কোটি ১৬ লাখ টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। এছাড়া ব্লু চিপ সিকিউরিটিজের (সাবেক খুরশিদ সিকিউরিটিজ) বিরুদ্ধেও গ্রাহকের সোয়া দুই কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া আত্মসাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। তবে প্রতিবেদনে মোট আত্মসাতের অঙ্ক ৬৫০ কোটিরও বেশি উল্লেখ করা হলেও বাকি অর্থ কোন ব্রোকারেজ হাউসের, সে তথ্য স্পষ্ট করা হয়নি।
তদন্তে জালিয়াতির দুটি প্রধান কৌশল উঠে এসেছে। প্রথমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তে ভুয়া বা ডুপ্লিকেট সফটওয়্যার ব্যবহার করে ডিএসই ও গ্রাহকদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেখানো হতো। দ্বিতীয়ত, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সিস্টেমে গ্রাহকের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নম্বর যুক্ত করা হতো। ফলে শেয়ার কেনাবেচার এসএমএস বা নোটিফিকেশন গ্রাহকের পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের কাছে যেত এবং গ্রাহকের অজান্তেই শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ব্রোকারেজ হাউসে অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর নির্দেশ দিয়েছে। তবে ডিএসইর অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২৮০টি প্রতিষ্ঠান নতুন সফটওয়্যার গ্রহণ করলেও ১১৮টিতে এখনো বিনিয়োগকারীর তথ্য হালনাগাদ হয়নি এবং ১০২টিতে লেজার ও পোর্টফোলিও স্থানান্তরের কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। এছাড়া ২৪টি প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করছে এবং ১৩৫টি ব্রোকারেজ হাউস গ্রাহকদের লেনদেন-সংক্রান্ত এসএমএস বা ই-মেইল পাঠায় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘাটতিই জালিয়াতির সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তদন্তে চিহ্নিত সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি ধরা পড়ার পর মশিউর সিকিউরিটিজের লেনদেন ও ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্ট (ডিপি) কার্যক্রম স্থগিত করা হয়; বিষয়টি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়াধীন। একইভাবে, ১৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২১ সালের নভেম্বরে তামহা সিকিউরিটিজের কার্যক্রম বন্ধ করে ডিএসই। বিএসইসির তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. হারুনুর রশীদ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে আসে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ১০টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ও শাখা অফিস বন্ধ রয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ডিএসইর আকস্মিক পরিদর্শনে সালতা ক্যাপিটালের কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) ঘাটতি ধরা পড়ে। পরে বিএসইসির তদন্তে ১০০ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিএসই জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে কঠোর নজরদারি চলছে। ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০ কোটি টাকা (নিরীক্ষা অনুযায়ী ১০৫ কোটি টাকা) আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদ উল্লাহ ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বাংকো সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশ ছাড়ার সময় চেয়ারম্যান আবদুল মুহিতকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা বিচারাধীন। ১৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৯ সালে শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজের ট্রেডিং রাইটস এনটাইটেলমেন্ট (টিআরই) সনদ স্থগিত করে ডিএসই। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। ব্লু চিপ সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধেও গ্রাহকের শেয়ার বিক্রি, চেক ডিজঅনার এবং অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা চলছে। তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা এখনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। বারবার টাকা ফেরতের দাবি উঠলেও অধিকাংশই তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাননি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ডিএসইর ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) থেকে মাত্র ৩৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, যা তিনটি ব্রোকারেজ হাউসের সীমিতসংখ্যক গ্রাহকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার জানান, অতীতের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এমন জালিয়াতি ঠেকাতে একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে। এটি চালু হলে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিদিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব সমন্বয় করা সম্ভব হবে। কোনো অমিল দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দেবে সিস্টেম, ফলে দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে এবং প্রয়োজন হলে আকস্মিক পরিদর্শনও চালানো যাবে। তিনি আরও বলেন, ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ডিএসইর নেই। তাই তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়লে প্রতিবেদন বিএসইসিতে পাঠানো হয় এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নেয় কমিশন।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশাপাশি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। আত্মসাৎ করা অর্থ বিনিয়োগকারীদের ফেরত দিতে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য আইনগত বিষয়ও পর্যালোচনাধীন রয়েছে।’
