সাড়ে ১৫ বছরে সামিট পাওয়ারের আকাশচুম্বী উন্নতি!

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ছিল দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। এই খাতের প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত আজিজ খানের সামিট পাওয়ার। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ফারুক খানের ভাই হওয়ায় তিনি বিগত সরকারের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৯৭ সালে বিদ্যুৎ ব্যবসায় প্রবেশ করলেও ২০০৯ সালের পর থেকেই সামিট পাওয়ারে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ঘটে।

দরপত্র ছাড়া একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স পাওয়া ও তার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করে নিয়েছে সামিট পাওয়ার। আবার সরকারের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আজিজ খান সিঙ্গাপুরের অন্যতম শীর্ষ ধনীর তালিকায়ও নাম লিখেছেন। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় ৪১তম অবস্থানে আছেন। তার সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার বা ১৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা।

গত দেড় দশকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাড়ে ১৫ বছরে সামিট পাওয়ারের সম্পদের পরিমাণ ৬৭০ কোটি ৭১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৮৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে ১৫ বছরে সম্পদের পরিমাণ ১৬ গুণ হয়েছে। আর এ সময় সামিট পাওয়ারের নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ছয় হাজার ৬৯২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গত দুই বছর কোম্পানিটির মুনাফা কিছুটা কমেছে। তবে ডলারের বিনিময় হারের জন্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোম্পানিটি নানা তদবির করে যাচ্ছে।

সামিট পাওয়ারের তথ্যমতে, ২০০১ সালে প্রথম উৎপাদনে আসে সামিটের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। সে সময় কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩৩ মেগাওয়াট। ২০০৮ সালে এ সক্ষমতা দাঁড়ায় ১০৫ মেগাওয়াটে। মূলত ২০০৯ সালের পর থেকেই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে একের পর এক বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তিতে আবদ্ধ হতে থাকে কোম্পানিটি। প্রথমে কুইক রেন্টাল, পরে আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে থাকে সামিট পাওয়ার।

২০২৪ সালের জুন শেষে সামিট পাওয়ারের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৯৭৬ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। পাশাপাশি, ৫৪১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন শুরু করায় সামিট পাওয়ারের মোট উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৫১৭ মেগাওয়াটে। এর মাধ্যমে সামিটের উৎপাদন সক্ষমতা গড় হিসাবে সাড়ে ১৫ বছরে প্রায় ১৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণের আগে সামিট পাওয়ারের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬৭০ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ছিল ৪৬ কোটি ২ লাখ টাকা। পরবর্তী বছরে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১,০১২ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ৭০ কোটি ৮ লাখ টাকা। ২০১০ সালে সম্পদ বেড়ে হয় ১,৪৫৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ১০৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। ২০১১ সালে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২,০৩৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা, নিট মুনাফা ৩০৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

২০১২ হিসাব বছরে সম্পদ সামান্য বেড়ে হয় দুই হাজার ১২৩ কোটি ছয় লাখ এবং নিট মুনাফা ২৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ২০১৩ হিসাব বছরে সম্পদ দাঁড়ায় দুই হাজার ২০৩ কোটি ৫২ লাখ এবং নিট মুনাফা ২৮২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, ২০১৪ হিসাব বছরে দুই হাজার ৭০৪ কোটি ৩৭ লাখ এবং নিট মুনাফা ২৮৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ২০১৫ হিসাব বছরে সম্পদ ছিল দুই হাজার ৮৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং নিট মুনাফা হয় ৩৭৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। আর্থিক বছরের সময়কাল পরিবর্তন করায় ২০১৬ সালের জুনে ছয় মাসের হিসাব প্রকাশ করে কোম্পানিটি। এতে ৩০ জুন শেষে সামিট পাওয়ারের সম্পদ দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৪৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর ছয় মাসে নিট মুনাফা হয় ২৩২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

এরপর থেকে জুলাই-জুন ধরে হিসাব বছর গণনা শুরু হয়। এতে ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে সামিট পাওয়ারের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় চার হাজার ২৪৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা হয় ৪৩৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে সম্পদ দাঁড়ায় ছয় হাজার ৪৩৪ কোটি ৫৬ লাখ এবং নিট মুনাফা ৫২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে সম্পদ বেড়ে হয় সাত হাজার ১৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ৭২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে সম্পদ কিছুটা কমে যায়। ওই বছর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় হাজার ৯৩৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা হয় রেকর্ড ৮৪৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

করোনা-পরবর্তী সময়ে আবারও সম্পদ বাড়ে সামিটের। এতে ২০২০-২১ হিসাব বছরে সম্পদ দাঁড়ায় সাত হাজার ৯০৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা হয় ৮৪২ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এরপর সামিটের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ শুরু করা হয়, যা সামিট মেঘনাঘাট-২ নামে পরিচিত। এতে সামিটের সম্পদ এক লাফে অনেকটা বেড়ে যায়। যদিও ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে মুনাফার পরিমাণ করতে শুরু করে।

এর মধ্যে ২০২১-২২ হিসাব বছরে কোম্পানিটির সম্পদ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। তবে নিট মুনাফা কমে হয় ৬৭৩ কোটি টাকা। এদিকে ডলারের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ও জ্বালানি তেল আমদানির বিল ডলারের পূর্বের মূল্য পরিশোধের কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছর সামিটের মুনাফায় ধস নামে। ওই অর্থবছর সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ১১ হাজার ১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা হলেও মুনাফা কমে দাঁড়ায় ১৭১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। যদিও সামিট জ্বালানি তেল আমদানি দিনের পরিবর্তে মূল্য পরিশোধের দিনের ডলারের দর নেয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে যাচ্ছে। তবে সরকার সেটি অনুমোদন করেনি। সেটি অনুমোদন হলে সামিটের মুনাফায় উল্লম্ফন হতো।

অন্যদিকে বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছর সামিটের সম্পদের পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৮৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে মুনাফা আবার বেশ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। তবে গত অর্থবছর ও চলতি অর্থবছরের শুরুতে ডলারের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। এজন্য সামিট পাওয়ার আবারও ডলারের বিনিময় হারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নানা ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

যদিও দেশের মুনাফায় পরিবর্তন সিঙ্গাপুরের আজিজ খানের সম্পদের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের সর্বশেষ প্রকাশিত সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় আজিজ খান রয়েছে ৪১তম স্থানে। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, মুহাম্মদ আজিজ খানের মোট সম্পদ রয়েছে এক দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান দেশে বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ব্যবসায়ও সামিটের অংশগ্রহণ রয়েছে।

২০১৮ সালে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ডলার। ২০১৯ সালে এটি কমে ৮৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২০ সালে সম্পদ বেড়ে ৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার হয়। ২০২১ সালে আজিজ খানের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯৯ কোটি ডলার। পরের বছরই তা ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। ফোর্বসের ২০২২ সালের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীর তালিকায় আজিজ খানের অবস্থান ছিল ৪২ নম্বরে। সে সময় তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৩ সাল থেকে তিনি বর্তমানে অবস্থানে আছেন।

উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে আইটি, বন্দর ও রিয়েল এস্টেট খাতেও। আঞ্চলিক ফাইবার অপটিক কেব্লের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতকে যুক্ত করেছে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড। এছাড়া বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সাবমেরিন কেব্ল স্থাপনের বিষয়টিও এখন প্রক্রিয়াধীন। কোম্পানিটির সাবসিডিয়ারি সামিট টাওয়ার্স লিমিটেডের মাধ্যমে দেশের টেলিকম খাতের টাওয়ার শেয়ারিং ব্যবসায়ও নাম লিখিয়েছে সামিট গ্রুপ।

সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের (এসএপিএল) মাধ্যমে বন্দর ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে সামিট গ্রুপ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় অফ-ডক (অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল) ফ্যাসিলিটিগুলোর অন্যতম। তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি দেশের রপ্তানি পণ্যের কনটেইনারের ২০ শতাংশ ও আমদানি পণ্যের কনটেইনারের প্রায় আট শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। এছাড়া সামিট পোর্ট অ্যালায়েন্সের একটি সাবসিডিয়ারি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট ইস্ট গেটওয়ে (আই) প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে ভারতের কলকাতা বন্দরের জেটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এর বাইরে কোম্পানিটির সিঙ্গাপুরভিত্তিক সাবসিডিয়ারি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট পিটিই লিমিটেড আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করে।

চট্টগ্রাম, মুক্তারপুর ও কলকাতার বন্দর ব্যবসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে এ সাবসিডিয়ারি। ভারতের পাটনায়ও একটি বন্দর উন্নয়নের কাজ পেয়েছে সামিট, যা এখন নির্মাণাধীন। আবাসন খাতের ব্যবসার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট রয়েছে সামিট গ্রুপ। ঢাকায় ৩২ লাখ বর্গফুট স্পেস নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গ্রুপটি। পাঁচ তারকা ও চার তারকা হোটেল নির্মাণের কাজও করেছে তারা। এছাড়া বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের কাজ করেছে সামিট টেকনোপলিস লিমিটেড।

বাংলাদেশের বাইরে প্রথমবারের মতো ভারতের ত্রিপুরায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের শেয়ার কিনেছে সামিট। সামিট ইন্ডিয়া (ত্রিপুরা) ওএনজিসি ত্রিপুরা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ২৩.৫০ শতাংশ শেয়ার অর্জন করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সামিটের কোনো বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ নেই। তাহলে এই বিনিয়োগগুলো কীভাবে করা হলো, সে বিষয়ে সরকারের কোনো জবাব নেই। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট (আইসিআইজে) প্রকাশিত অফশোর লিকস ডেটাবেজে আজিজ খান ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম উঠে আসে। যদিও সে সময় টাকা পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন আজিজ খান।

**সামিট গ্রুপের ১৯১ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ
**ব্যান্ডউইডথের ৫০ শতাংশের বেশি সামিটের দখলে