সরকারকে অবশ্যই আর্থিক সংযম দেখাতে হবে

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

নতুন সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযম অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সরকারের এই মুহূর্তে কোনো জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। বাজেটে কৃচ্ছ্রসাধন নিশ্চিত করতে হবে, তা সম্ভব না হলে অন্তত আর্থিক সংযম দেখাতে হবে।বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীয়ে ব্র্যাক সেন্টার ইনে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।

অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘গত অন্তর্বর্তী সরকার যেসব ক্রয় চুক্তি করে গেছে, সেখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। গত সরকার বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক চুক্তিও করেছে। এসব বৈদেশিক চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি বা শুধু বন্দর দিয়ে দেওয়ার জন্য হয়নি। অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে হয়তো আমরা এখনো অবহিত না। এসব বৈদেশিক চুক্তিকে পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’

নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘এই দলের প্রাথমিক কাজ হবে গত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ময়নাতদন্ত করে একটি দলিল বা ব্রিফিং ডকুমেন্ট তৈরি করা। সেটার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।’ এ ছাড়া আগামী মার্চ মাসের শেষ নাগাদ সরকার যেন জাতীয় সংসদে একটি আর্থিক বিবৃতি দেয়, সেই পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টচার্য। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে প্রণীত সরকারি আয় ব্যয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে আর্থিক বিবৃতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারা রয়েছে। এই আর্থিক বিবৃতি সরকারের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পাহারাদার হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বলা হচ্ছে, ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোবে। তবে আমি সরকারের যেকোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করার বিপক্ষে। আমি ধৈর্য ধরতে বলব। চলতি অর্থবছরে নতুন কিছু না করে; বরং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযম দেখালে আগামী অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্য অসুবিধাগুলো পরিষ্কারভাবে উতরে যাবে।’

সরবরাহশৃঙ্খলে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের তথ্য–উপাত্ত বলছে, রমজান মাসের প্রয়োজনীয় পণ্যের যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ রয়েছে। আমরা জানি যে নিত্যপণ্যের সরবরাহশৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্ডিকেট রয়েছে। নতুন সরকারি দলের নেতারা বলেছেন, তাঁরা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন। সরকারের প্রথম দিন থেকে আমরা সেটি দেখার অপেক্ষায় আছি।’

অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর প্রদত্ত প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানো উচিত। কারণ, বর্তমান প্রণোদনা রাজস্বের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে এবং তার ওপর আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তবে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়। এই অর্থনৈতিক চাপ অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান আরও জানান, প্রণোদনা কমানোর পাশাপাশি টাকার মূল্য বাজারভিত্তিক করা যেতে পারে। এতে প্রবাসীরা প্রতি ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা পাবেন। ফলে, যদি টাকার কিছুটা অবমূল্যায়ন (ডেপ্রিসিয়েশন) ঘটে, তাতেও রেমিট্যান্সের প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।