দেশের সমুদ্রসীমায় নতুনভাবে আরও ৬৫ প্রজাতির মাছ চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি প্রজাতি পুরো বিশ্বে প্রথমবার দেখা গেছে। এর আগে সাগরে মোট ৪৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। আগের প্রজাতিগুলোর সঙ্গে এখন নতুন এই প্রজাতিগুলোও যুক্ত হবে। এসব মাছের ইতিহাস ও গোত্র নির্ধারণের জন্য নমুনাগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া, প্রথমবারের মতো দেশের সমুদ্রসীমায় টুনা মাছের উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছে।
রোববার (নভেম্বর) হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদপ্তর এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-র যৌথ উদ্যোগে করা মৎস্যসম্পদ জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রউফ। এফএওর সহায়তায় ৮টি দেশের ২৪ জন বিজ্ঞানী মাসব্যাপী জরিপটি পরিচালনা করেছেন। জাতিসংঘের একটি গবেষণা জাহাজ ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের ৬৮টি স্টেশন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ সম্পন্ন করেছে।
জরিপ দলের নেতৃত্বে ছিলেন নরওয়ের বিজ্ঞানী এরিক ওলসেন, আর বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী। জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের সীমান্তে প্রথমবারের মতো টুনা মাছ পাওয়া গেছে। মাছের সঙ্গে টুনা মাছের লার্ভা বা বাচ্চাও ধরা পড়েছে, যা দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। এখন দেশি-বিদেশি বা যৌথ বিনিয়োগে টুনা মাছ আহরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, দেশের সমুদ্রের মাত্র ২০০ মিটার গভীরে মাছ ধরা গেলেও গভীর সাগরের ৭০০ মিটার নিচেও মাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নতুন ৬৫ প্রজাতির মাছের বিস্তারিত গবেষণার জন্য নমুনা দক্ষিণ আফ্রিকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় মাছ ধরা হলেও গভীর সাগরে এখনও যথাযথ মাছ আহরণ হচ্ছে না, তাই গভীর সাগর থেকে মাছ ধরার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এদিকে জরিপে বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ আহরণ কমে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। দেশের প্রধান ২০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ২০১৮ সালে ৯ প্রজাতির মাছ আহরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উপযোগিতা ছিল, কিন্তু এবার তা ৫টিতে নেমে এসেছে। জরিপের তথ্যে বলা হয়, সাগরের পানির ওপরের স্তরের ছোট আকৃতির (স্মল প্যালাজিক) মাছের পরিমাণও কমে এসেছে। ২০১৮ সালে যেখানে স্টক ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ হাজার ৮১১ টনে। একইভাবে ২০১৮ সালে গভীর সাগরে জেলি ফিশের উপস্থিতি থাকলেও এখন তা উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে জেলেদের জাল জেলি ফিশে ভরে যাচ্ছে।
জরিপের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সাগরের ৮০ থেকে ৯০ মিটারের পর অক্সিজেনের মাত্রা কম। কিছু জায়গায় অক্সিজেন নেই বললেই চলে। তবে সাগরে প্রচুর উদ্ভিদের উপস্থিতি দেখা গেছে। আমাদের জাহাজ সাগরের উপকূলের ২০ মিটারের নিচে নামতে পারে না। তাই উপকূলের কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি।’
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘নতুন এ জরিপের ফলাফল আমাদের সমুদ্র ব্যবস্থাপনা, নতুন পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণে সহায়তা করবে। বঙ্গোপসাগরে গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে নতুন জাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যই এটা করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সচিব আবিদ হোসেন বলেন, ‘সাগরে মাছের পরিমাণ কমছে। এটা আমাদের জন্য খুবই অ্যালার্মিং বিষয়। এটা নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করা না হলে সাগরে মাছ ধরা শিল্প হারিয়ে যাবে।’ দুই বছর ধরে সাগরে মাছ নেই বলে মন্তব্য করেন কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এটার কোনো সুফল পাচ্ছি না আমরা। সাগরে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে টহল জোরদার করা উচিত।’
