বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার এ বিষয়ে আদালত একটি রুল জারি করে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপ করে ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছেন। আদালত সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপ পররাষ্ট্র নীতি ও অর্থনীতিকে গুরুতর ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। তবে এই রুল জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প জানান, পাল্টা শুল্কের পরিবর্তে তিনি বিশ্বজুড়ে ১০ শতাংশ হারে নতুন শুল্ক আরোপের একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, ওভাল অফিসে বসেই নতুন নির্বাহী আদেশে সই করেছেন এবং এটি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। এর আগে একই দিন ভিন্ন এক আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে শুল্ক আরোপের বিকল্প পথ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ ও ‘ভয়ঙ্কর’ বলে মন্তব্য করে ট্রাম্প তীব্র সমালোচনা করেন। হোয়াইট হাউস–এর ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আদালত যে সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করেছে, সেগুলোর পরিবর্তে অন্য বিকল্প প্রয়োগ করা হবে। তার ভাষায়, তাদের কাছে একাধিক শক্তিশালী বিকল্প রয়েছে, যা থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব এবং এতে দেশ আরও শক্তিশালী হবে।
হোয়াইট হাউস–এর এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি করা দেশগুলোর ওপরও নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে। ফলে এসব দেশ চুক্তিতে নির্ধারিত আগের শুল্কহারের বদলে সেকশন ১২২–এর আওতায় ১০ শতাংশ হারে শুল্ক দেবে। তিনি বলেন, এই তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর ফলে ট্রাম্পের করা অনেক বাণিজ্য চুক্তিতে শুল্কের হার আগের তুলনায় কমে আসবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, পূর্বের চুক্তিতে জাপানের ওপর ১৫ শতাংশ এবং ভারতের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। কর্মকর্তা আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের আশা—বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যেসব ছাড়ে দেশগুলো সম্মত হয়েছিল, সেগুলো তারা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে।
সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জন ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণার পক্ষে মত দিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। এই সিদ্ধান্তটি ওইসব এই শুল্কবিরোধী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য বড় বিজয়। এর ফলে ইতিমধ্যে শুল্ক বাবদ দেওয়া শত শত কোটি ডলার ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে একইসঙ্গে এই রায় বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তারও জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, আইনি লড়াই ছাড়া এই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে না। তিনি আশা করছেন, বিষয়টি নিয়ে বছরের পর বছর আদালতে আইনি লড়াই চলতে পারে। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার রায়ে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কংগ্রেসকে, প্রেসিডেন্টকে নয়। তিনি লিখেছেন, অস্বাভাবিক ক্ষমতার চর্চা হিসেবে শুল্ক আরোপের জন্য প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ‘স্পষ্ট অনুমোদনের’ প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তিনি তা পারেননি। আদালতের মতে, আইইইপিএ আইনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘আমদানি’ শব্দ দুটি থাকলেও, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে অসীম সময়ের জন্য শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, নিজের শুল্কনীতি এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি অন্য আইনের আশ্রয় নেবেন। তার মতে, এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। মূলত বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করা আমদানি শুল্ক নিয়ে ছিল আদালতের এই লড়াই। শুরুতে এই শুল্ক মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর আরোপ করা হয়। পরে গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর পরিধি বাড়িয়ে আরও ডজনখানেক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর তা প্রয়োগ করা হয়। হোয়াইট হাউস ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট-এর (আইইইপিএ) বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, এই আইন প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থায় বাণিজ্য ‘নিয়ন্ত্রণের’ ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এ পদক্ষেপের ফলে দেশে-বিদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
গত বছর আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রতিবাদকারী অঙ্গরাজ্য ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনজীবীরা বলেন, ট্রাম্প শুল্কারোপের জন্য যে আইন ব্যবহার করেছেন, সেখানে ‘শুল্ক (ট্যারিফ)’ শব্দটির কোনো উল্লেখই নেই। তারা বলেন, কংগ্রেস তাদের কর আদায়ের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। এমনকি বিদ্যমান অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক বিধিগুলোকে ‘বাতিল করার জন্য প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন ক্ষমতা’ দেওয়ার উদ্দেশ্যও কংগ্রেসের ছিল না। রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার মতামতে এই যুক্তির পক্ষেই অবস্থান নেন।
শুল্ক বাতিলের এই সিদ্ধান্তে আদালতের তিনজন উদারপন্থি বিচারপতির সঙ্গে যোগ দেন ট্রাম্পের মনোনীত দুই বিচারপতি—অ্যামি কোনি ব্যারেট ও নিল গোরসাচ। আর তিন রক্ষণশীল বিচারপতি—ক্ল্যারেন্স টমাস, ব্রেট কাভানাফ ও স্যামুয়েল আলিটো এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, আদালতে রিপাবলিকান দলের মনোনীত যেসব বিচারপতি তার বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, তাদের নিয়ে তিনি ‘ভীষণ লজ্জিত’। তিনি বলেন, ‘দেশের জন্য সঠিক কাজটি করার সাহস দেখাতে না পারায় আদালতের নির্দিষ্ট কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে আমি লজ্জিত, ভীষণ লজ্জিত।’ ট্রাম্প আরও বলেন, এ রায়ের কারণে ‘যেসব বিদেশি রাষ্ট্র বছরের পর বছর আমাদের ঠকিয়ে আসছিল, তারা এখন উচ্ছ্বসিত। তারা এতটাই খুশি যে রাস্তায় নেচে বেড়াচ্ছে। তবে তারা বেশিদিন এই নাচ নাচতে পারবে না, এটুকু আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ করে। তবে শুল্কের খরচ থেকে মুক্তি ও অর্থ ফেরতের যে আশা করা হচ্ছে, তা হয়তো শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যেতে পারে।
শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সেকশন ১২২ নামের একটি দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা আইনের আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাপত্রে সই করেন। এ আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যায়, যা ১৫০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে। এরপর বিষয়টি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নতুন শুল্ক আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। আদেশে বিভিন্ন পণ্যে শুল্কছাড়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কমলা ও গরুর মাংসসহ কয়েকটি কৃষিপণ্য, ওষুধসামগ্রী, কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু যানবাহন অন্তর্ভুক্ত। তবে ঠিক কোন কোন পণ্য এ ছাড় পাবে, তা আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
