সনাতন পদ্ধতিতে শতকোটির লবণবাণিজ্য

একসময় ঝালকাঠির নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত লবণশিল্পের কর্মচাঞ্চল্য। কক্সবাজারসহ উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রলারভর্তি কাঁচা লবণ আসত সেখানে। এরপর কারখানাগুলোতে লবণ পরিষ্কার, পরিশোধন, আয়োডিন মেশানো, শুকানো ও প্যাকেটজাত করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন শত শত শ্রমিক। পরে নৌ ও সড়কপথে এসব লবণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো।

কালের পরিক্রমায় সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্পে নেমেছে ধস। একসময় ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি লবণকল থাকলেও এখন চালু আছে আটটি। এসব কারখানায় মাসে গড়ে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টন এবং বছরে প্রায় ২০ হাজার ৪০০ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ টন ভোজ্য ও শিল্প লবণ উৎপাদিত হয়। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় এক হাজার শ্রমিকের। বছরে বিক্রি হয় ২০০ কোটি টাকার বেশি।

ব্রিটিশ আমল থেকে ঝালকাঠি ও আশপাশের অঞ্চলে লবণের ব্যবসা চলছে। নদীপথের সুবিধা ও নদীবন্দরকেন্দ্রিক আড়তের কারণে একসময় দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে ঝালকাঠি। বাসন্ডা নদীর দুই তীরেও গড়ে উঠেছিল বহু লবণকল। কক্সবাজার থেকে নৌপথে আনা অপরিশোধিত লবণ স্থানীয় কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে বরিশাল বিভাগের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হতো।

বর্তমানে চালু থাকা আটটি লবণকলের মধ্যে তিনটিতে আধুনিক পদ্ধতিতে এবং বাকি পাঁচটিতে পুরনো প্রযুক্তিতে উৎপাদন চলছে। উদ্যোক্তারা জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকঋণ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ায় অনেক কারখানা আধুনিকায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদনে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি লাগছে, পাশাপাশি বাড়ছে খরচ। অন্যদিকে বড় কোম্পানি ও আমদানিনির্ভর শিল্প লবণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছে ছোট কারখানাগুলো। চীন, ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিল্প লবণ আমদানি এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাজার সম্প্রসারণের কারণে স্থানীয় ছোট উদ্যোক্তারা চাপে পড়ছেন। তাঁদের মতে, বড় কোম্পানিগুলো ব্যাপক পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করায় তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম পড়ে।

নিউ ঝালকাঠি সল্ট মিলের মালিক আবু বক্বর সিদ্দিক বলেছেন, আধুনিক মেশিনে লবণ পরিশোধন করায় খরচ কিছুটা কমেছে। তবে তেলের দাম বাড়ায় আবার পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তার দাবি, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তাজ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মো. ইলিয়াছ জানালেন, ‘বর্তমানে অবস্থা তেমন ভালো নয়। বেচাকেনা কম। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করতে খরচ বেশি হয়।’

ঝালকাঠির লবণশিল্পে একসময় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। এখন কাজ করেন প্রায় এক হাজার। শ্রমিক আবদুল লতিফ বলেছেন, ‘আগে কাজ বেশি ছিল, প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত। এখন কাজ কমে যাওয়ায় সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন কাজ করেই থাকতে হয়। এতে সংসারের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে।’ ঝালকাঠি বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেছেন, পুরনো যন্ত্রপাতি ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়ছেন। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে আর্থিক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জানালেন, সনাতন পদ্ধতির মিলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। বর্তমানে কারখানাগুলো শুধু জেলার চাহিদা নয়; বরিশাল বিভাগের চাহিদা মিটিয়েও বিভিন্ন জেলায় লবণ সরবরাহ করছে।