সংসদে ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকার বাজেট পাস

নতুন অর্থবছরে সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে অনুমোদন পেয়েছে; মঙ্গলবার অধিবেশনে নির্দিষ্টকরণ বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে এ বাজেট চূড়ান্ত হয় এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর হবে। এর আগে সোমবার করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে করছাড় সংবলিত ৬৪টি সংশোধনীসহ অর্থ বিল, ২০২৬ পাস করা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন এ বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যার শিরোনাম ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। প্রস্তাবিত এ ব্যয় বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশের সমান; উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধনে কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।

নির্দিষ্টকরণ বিল, ২০২৬ অনুযায়ী সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে অর্থ প্রদান ও ব্যয়ের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিলে উল্লেখ রয়েছে, নির্দিষ্টকরণ আইন, ২০২৬ আগামী ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। এ আইনের তফসিলে উল্লিখিত খাতগুলোর বিপরীতে সংযুক্ত তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৯ কোটি ৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং সংসদে ভোটের মাধ্যমে গৃহীত মঞ্জুরির পরিমাণ ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪১৪ কোটি ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় নির্বাহ এবং ২০২৭ সালের ৩০ জুন সমাপ্য অর্থবছরের জন্য সরকারের অনুমিত ব্যয় সম্পর্কে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত মঞ্জুরির বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ নির্দিষ্টকরণের বিধান করতেই বিলটি আনা হয়েছে। নির্দিষ্টকরণ বিলটি অর্থ বিল বা মানি বিল হিসেবে সংসদে উত্থাপনের জন্য সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সুপারিশ লাগে।

বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দায়যুক্ত ব্যয় বাদে অন্যান্য ব্যয়ের মঞ্জুরি দাবিগুলোর ওপর ভোট গ্রহণ করা হয়। এবারের বাজেটে মোট ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপিত হয়, যার বিপরীতে ৪৩ জন সংসদ সদস্য ১ হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিস দেন। বিরোধী দল ৩৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন খাতসংক্রান্ত ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনার জন্য তালিকা দেয় এবং সেই অনুযায়ী আলোচনা শুরু হয়। ৩৩ নম্বর দাবির ওপর ভোট গ্রহণ শেষে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সব ছাঁটাই প্রস্তাব একসঙ্গে প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবগুলো মূলত বিরোধী দলের পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছে এবং সংসদের প্রচলিত রেওয়াজের প্রতি সম্মান রেখেই, যেহেতু এসব প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই মূল্যবান সময় সাশ্রয়ের জন্য সেগুলো প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করা হলে কাজ সহজ হবে।

এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমার মনে হয় ট্রেজারি বেঞ্চ আপনার এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। স্পিকার বলেন, প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের পর মন্ত্রী প্রস্তাব উত্থাপন করলে সরাসরি ভোটে দেওয়া হবে। পরে ৩৫ নম্বর দাবি থেকে বাকি দাবিগুলো সরাসরি ভোটে দেন স্পিকার। মঞ্জুরি দাবিগুলো নিষ্পত্তির পর নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন করে সংসদ।

বড় বরাদ্দ যেসব খাতে

নির্দিষ্টকরণ বিলের তফসিল অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে অর্থ বিভাগের জন্য। এ খাতে দায়যুক্ত ব্যয় ও সংসদে ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি মিলিয়ে মোট ৮ লাখ ৩০ হাজার ৫৫১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরপর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ২৪৮ কোটি ৯১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য রাখা হয়েছে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য ৪০ হাজার ২৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ৯১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, পরিকল্পনা বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ২৫১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩২ হাজার ৪১৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৩০ হাজার ৪৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে; বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি ২ লাখ টাকা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জন্য ২ হাজার ৩৪৯ কোটি ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ পেয়েছে ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। নতুন বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি; এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা, যা আগেই অনুমোদিত। অর্থমন্ত্রী উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ মোট বাজেটের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করেন এবং পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামানোর কথা জানান। খাদ্য হিসাব, ঋণ ও অগ্রিম, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং কাঠামোগত সমন্বয় বাদে পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের তুলনায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় ধরা হয়েছে অন্তত ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি।এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ২০ শতাংশের বেশি। গতবারের মত এবারও সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে। এ খাতে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে।

নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিদেশি অনুদান থেকে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার। নতুন বাজেটে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

বাজেটের অর্থায়নের অংশ হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে; পাশাপাশি বিদেশি উৎস থেকেও ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে তা কমে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১০ মাস মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে তা এক অংকের ঘরে নেমে এসেছে, তবে এখনও ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে; মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে নতুন অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।