সংযোজনেই সীমাবদ্ধ মোটরসাইকেল শিল্প

মহাসড়ক থেকে গ্রামাঞ্চলের সরু পথ—সর্বত্রই এখন মোটরসাইকেলের দাপট। যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে এ বাহন। অনেক মোটরসাইকেলে বড় করে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা থাকায় এগুলোকে দেশীয় পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে উদ্যোক্তারা নানা সুবিধা পাচ্ছেন। তবে গত পাঁচ বছরের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র—এসব মোটরসাইকেল মূলত ভারত থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশে শুধু সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে, অর্থাৎ ‘নাট-বোল্ট’ জুড়ে অ্যাসেম্বলিংই প্রধান কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশে মোটরসাইকেল খাতে এখনো মৌলিক উৎপাদন বা প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা গড়ে ওঠেনি। এক দশক পার হলেও শীর্ষ কোম্পানিগুলো নিজস্ব ইঞ্জিন বা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি; বরং বিদেশ থেকে পার্টস আমদানি করে কেবল সংযোজন করে তা ‘দেশীয় পণ্য’ হিসেবে বাজারজাত করছে। গত পাঁচ বছরে শুধু ভারত থেকেই প্রায় ৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকার মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশ আমদানি হয়েছে, যার ৮২ শতাংশ এনেছে দেশের মাত্র চারটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত এই আমদানির বিপরীতে প্রায় ৪ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, সম্পূর্ণ সংযোজিত (সিবিইউ) ও খণ্ডিত অবস্থায় আমদানিকৃত (সিকেডি) মোটরসাইকেলের শুল্ক কাঠামোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ থেকে ১৫০ বা তদূর্ধ্ব সিসির সিবিইউ মোটরসাইকেল আমদানিতে মোট করভার সর্বোচ্চ ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে সিকেডি আকারে আমদানিতে মোট করভার মাত্র ২৬ শতাংশ থেকে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ পর্যন্ত। সিকেডি বলতে শুধু কয়েকটি যন্ত্রাংশ নয় বরং প্রায় পুরো মোটরসাইকেলই খণ্ড খণ্ড অবস্থায় দেশে আনা হয়। এর মধ্যে থাকে ইঞ্জিন অ্যাসেম্বলি, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট, পিস্টন, সিলিন্ডার হেড, গিয়ারবক্সের বিভিন্ন অংশ, ফ্রেম, সুইং আর্ম, ব্রেক ক্যালিপার, ডিস্ক প্যাড, ড্রাইভ চেইন-স্প্রকেট, সিডিআই ইউনিট, স্পার্ক প্লাগ, হ্যান্ডেলবার, কন্ট্রোল ক্যাবল, হেডলাইট, ইন্ডিকেটর, মাডগার্ড ও অন্যান্য প্লাস্টিক বডি পার্টস।

মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে শুল্কসহ করভার সাধারণত ২৬ থেকে ৫৮ শতাংশের মধ্যে এবং ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে তা ৪৩ থেকে ৯৬.১০ শতাংশ পর্যন্ত হওয়ায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ শুল্কে সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল (সিবিইউ) আমদানি না করে তুলনামূলক কম শুল্কে যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজনকে বেশি লাভজনক বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে; ফলে সংযোজনভিত্তিক আমদানির মাধ্যমে তারা উল্লেখযোগ্য কর সুবিধা পাচ্ছে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় সিবিইউ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হলেও বাস্তবে কোম্পানিগুলো মূলত ভারত থেকে সিকেডি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এনে দেশে জোড়া লাগিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে বাজারজাত করছে, যার ফলে সংযোজন শিল্পের বিস্তার ঘটলেও স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তর সীমিতই রয়ে গেছে এবং ‘দেশীয়’ পরিচয়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে; পাশাপাশি কর সুবিধা নেওয়া সত্ত্বেও এর সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, অর্থাৎ বাজারে দামও কমছে না।

দাপট বাড়ছে সিকেডির

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে একসময় সম্পূর্ণ তৈরি (সিবিইউ) মোটরসাইকেল আমদানিই বেশি ছিল, কিন্তু এখন সেই জায়গা প্রায় পুরোপুরি দখল করেছে খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি (সিকেডি)। ২০২২ সালে ভারত থেকে সিবিইউ আমদানির শুল্কায়ন মূল্য ছিল প্রায় ১২০ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়ায় ৭০ কোটি টাকায় এবং ২০২৪ সালে নেমে আসে মাত্র ৩৫ কোটি টাকায়; পরের বছর তা আরও কমে ২০ কোটি টাকার নিচে চলে যায়। বর্তমানে মূলত দেশে সংযোজন সম্ভব নয়—এমন উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত মোটরসাইকেলই সিবিইউ আকারে আমদানি হচ্ছে। বিপরীতে যন্ত্রাংশ আমদানিতে দেখা গেছে উল্টো প্রবণতা—২০২২ সালে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ আমদানি হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৯২০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ডলার সংকট ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ২০২৪ সালে এই অঙ্ক ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫ সালে সব রেকর্ড ভেঙে প্রায় ১ হাজার ৮১০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেশি। আর চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসেই দেশে এসেছে প্রায় ৬১০ কোটি টাকার মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশ।

সুবিধাভোগী ৪ প্রতিষ্ঠান

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তুলনামূলক কম শুল্কে সিকেডি আমদানির সবচেয়ে বড় সুবিধা ভোগ করছে মাত্র চারটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান, যাদের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে বাজারের সিংহভাগ। ভারত থেকে আমদানি হওয়া মোট মোটরসাইকেল ও যন্ত্রাংশের প্রায় ৮২.২ শতাংশই এনেছে এই চার প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে উত্তরা মোটরস লিমিটেড (বাজাজ), যারা গত পাঁচ বছরে প্রায় ১ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ আমদানি করে বাজারের ৩৬.২ শতাংশ দখলে রেখেছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা টিভিএস অটো বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকার আমদানির মাধ্যমে ২৪.৫ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা হিরো মোটরস (নিটল-নিলয়) একই সময়ে প্রায় ১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ আমদানি করে ২১.৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে। তালিকার শেষদিকে থাকা রানার মোটরস নিজেকে শীর্ষ উৎপাদক দাবি করলেও গত পাঁচ বছরে তারা ৪৬ কোটির বেশি টাকার ভারতীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করেছে, যা তাদের বাজার শেয়ার ৮.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রেখেছে। অন্যদিকে শতাধিক ছোট আমদানিকারক ও খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত অংশীদারিত্ব মাত্র ৯.৫ শতাংশ।

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নাকি শুধু সংযোজন?

মোটরসাইকেল শিল্পে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখনো ঘিরে আছে—দেশে প্রকৃত উৎপাদন আসলে কতটুকু হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট, সিলিন্ডার হেডসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়; দেশের কারখানাগুলোতে মূলত এসব পার্টস সংযোজন, রং করা ও মান নিয়ন্ত্রণের কাজই সীমাবদ্ধ। ফলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ের আড়ালে প্রকৃত স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একই সময়ে রাইড-শেয়ারিং, কুরিয়ার ও ই-কমার্স খাতের প্রসারের কারণে মোটরসাইকেলের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে, যা যন্ত্রাংশ আমদানিকেও আরও ত্বরান্বিত করেছে। তবে গত পাঁচ বছরের আমদানি তথ্য স্পষ্ট করে যে শিল্পটি এখনও বড় পরিসরে বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী দেশীয় মোটরসাইকেল শিল্প গড়ে তুলতে হলে সংযোজনের গণ্ডি পেরিয়ে ইঞ্জিন, ফ্রেম, প্লাস্টিক কম্পোনেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।