ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের শীর্ষ ১১ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, ঘুষ-দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তে গতি আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে যৌথ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অন্য দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শুধুমাত্র এসব মামলায় পূর্ণ সময় কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে থেকে কাজ করার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা আগে কখনো নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি প্রত্যাশিত না হওয়ায় সরকার এবার পুরো প্রক্রিয়াকে আরও নিবিড়ভাবে তদারকির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও দুদক স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের চিঠি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনাও হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদককে এভাবে কোনো মন্ত্রণালয় চিঠি দিতে পারে না। কিন্তু বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থ বিবেচনায় আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিকভাবে এ কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত যৌথ তদন্ত দলের অস্থায়ী কার্যালয় থেকেই কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শীর্ষ এসব শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি, ব্যাংক জালিয়াতি, ঘুষ ও দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে; তাই অনুসন্ধান শেষ হলে প্রয়োজনীয় ধারায় মামলা দায়ের করা হবে, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও হতে পারে। একই সঙ্গে এসব অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, নাসা, সিকদার ও আরামিটসহ আরও কয়েকটি গ্রুপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) যৌথ অনুসন্ধান শুরুর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। পরে ৬ জানুয়ারি তদন্তের কাঠামো, নেতৃত্ব ও কার্যপদ্ধতি চূড়ান্ত করা হয়। তদন্ত সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএফআইইউকে। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালায় সিআইডি, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও শুল্ক গোয়েন্দা। পুরো প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা দিচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতিটি গ্রুপের জন্য পৃথক তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিধান মেনে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অনুসন্ধান পরিচালনা করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স ও বিএফআইইউকে জানাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া, ভুয়া ও অতিমূল্যায়িত আমদানি-রপ্তানির (ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং) মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে আর্থিক নথি, ব্যাংক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। ইতোমধ্যে তদন্তাধীন অধিকাংশ শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে বিএফআইইউ এবং তাদের ঋণের ব্যবহার, প্রকৃত সুবিধাভোগী, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অর্থের গতিপথ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের তথ্য সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান দ্রুত শেষ করে আইনি পদক্ষেপ নিতে তদন্তে নিয়োজিতদের পূর্ণ সময় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, আন্তঃসংস্থার সমন্বিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আলোচিত শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়াও এগোবে। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি, তাই এ ধরনের মামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যৌক্তিক। তিনি আরও বলেন, এটিকে দুদক বা অন্য কোনো সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা উচিত।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘তবে শুধু অগ্রাধিকার দিলেই হবে না, এর বাস্তব প্রতিফলনও নিশ্চিত করতে হবে। যেসব কর্মকর্তাকে অন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে এই তদন্তে একচেটিয়াভাবে নিয়োজিত করা হবে, তাদের ওপর বড় ধরনের দায়িত্ব বর্তাবে। তারা যেন গভীরতা, নিরপেক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তদন্তের মান, গতি ও জবাবদিহির ওপর।’
** শীর্ষ ১০ গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত
** শীর্ষ পাঁচ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক
** ১০ শিল্পগোষ্ঠীর ১৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার জব্দ
** বিলিয়ন ডলার শিল্পগোষ্ঠীর ফাঁকি রোধ চায় ফিকি
** মেঘনা গ্রুপের এক লাখ কোটি টাকা পাচার
** করফাঁকির তদন্ত: সাত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত
** আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের ২৮ কোটি টাকা বিদেশে পাচার
** ১০১ অর্থ পাচারকারী শনাক্ত, ২০০ কোটি করে পাচার
** সাত ব্যক্তি-২ প্রতিষ্ঠান পাচার করেছে ১০১ কোটি টাকা
** রপ্তানির ছলে ১৫০০ কোটি টাকা পাচার
** পাচারের টাকায় বিদেশে ‘কামাল পরিবারের’ সাম্রাজ্য
** লোপাটের ৬১৬ কোটি টাকা কানাডায় পাচার
** পাচারের টাকায় ৮ গ্রুপের বৈশ্বিক সাম্রাজ্য
** পাচারের টাকায় দুবাইয়ে বাপবেটার অট্টালিকা
** ইনকামিং কল: দুই প্রতিষ্ঠানের পাচার ৮০০ কোটি টাকা
