সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশত্যাগকে ঘিরে নতুন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নয়; এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। সংশ্লিষ্ট কলরেকর্ড ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশ ছাড়ার আগে শেখ হাসিনা একাধিক মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
৪ আগস্ট তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে এক কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, আমি কিন্তু ঠিক করছিলাম, আজকে যাব রাষ্ট্রপতির কাছে। সব লিখে ঠিক করছিলাম। এভাবে মানুষ মেরে থাকার কোনো মানে হয় না। আর্মি চিফকে বলছি। সে ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছে। আর্মি চিফ চেষ্টা করুক, কিছু করতে। হাসিনার ব্যক্তিগত ফোনের কললিস্ট বলছে, ৪ আগস্ট উত্তাল একটি দিন পার করার পর, রাতে মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেন।
দেশত্যাগের আগে শেখ হাসিনা তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন। কলরেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একাধিকবার কথা বলেন। এমনকি বিমানে ওঠার পরও ওই কর্মকর্তা এবং তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা জানান, ৩ আগস্ট থেকেই কিছু নির্দিষ্ট নম্বর থেকে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও কিছু নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের তথ্য রহস্যজনকভাবে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত করা হবে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেলে এসব তথ্য অনুপস্থিত থাকার কারণও খতিয়ে দেখা হবে।
শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাহিনীর এমআই-১৭ হেলিকপ্টারের কল সাইন ছিল ‘লিওপার্ড ১০৩’। এটি আগারগাঁও এলাকা থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে যায়। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল ‘সি-১৩০ জে হারকিউলিস’ উড়োজাহাজ, যার কল সাইন ছিল ‘এজেএক্স ১৪১৩’। সাধারণত একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের আগে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলেও শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ট্যাক্সি ক্লিয়ারেন্স ও টেক-অফ অনুমতি পায়। বিমান বাহিনীর পরিভাষায় এ ধরনের দ্রুত উড্ডয়নকে স্ক্রাম্বল বা যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে যে বিমান বা হেলিকপ্টার উড়িয়ে নিতে হয়। শেখ হাসিনাকেও সেভাবে উড়িয়ে নেয় বিমান বাহিনীর এলিট ইউনিট এসএফইউ বা স্পেশাল ফ্লাইং ইউনিট।
এরপরেই ঘটে আচমকা ঘটনা। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিমানটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাতে সেটিকে কেউ ট্র্যাক করতে না পারে। ভারতের সীমান্তের কাছে পৌঁছানোর পর পুনরায় সেই ট্রান্সপন্ডার চালু করা হয়। এ ছাড়া বিমান রুটের ক্ষেত্রে কোনো ফ্লাইট সরাসরি দিল্লি গেলে তাকে রাজশাহী হয়ে যেতে হয়, কিন্তু সেই বিমান যায় সাতক্ষীরার উপর দিয়ে যাতে ৫-৭ মিনিট আগেই বাংলাদেশের আকাশ সীমানা পার হয়ে যেতে পারে শেখ হাসিনা।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজে করে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের ভারত গমনের ক্ষেত্রে কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কূটনৈতিক ছাড়পত্র এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আইনজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট পরিকল্পিত বিদেশ পালানো নিয়ে কেউ আদালত বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করলে বিষয়টির আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
