নানা ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব শিল্পগোষ্ঠী হলো বসুন্ধরা, যমুনা, হা-মীম, তমা ও ম্যাক্স। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন (অডিট রিপোর্ট) তলব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত ১২ জানুয়ারি দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান টিমের প্রধান ও পরিচালক আবুল হাসনাতের স্বাক্ষর করা পৃথক চিঠি জনতা, রূপালি, এনআরবি, প্রিমিয়ারসহ বিভিন্ন ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি)-তে পাঠানো হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, দায়িত্ব পাওয়া অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী কাজ করছেন। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা জানা যাবে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক নোটিশের পরও ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনীয় নথি জমা না পড়লে পুনরায় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কাছে তা তলব করা হবে।
দুদকের পাঠানো চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের অনুলিপি আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে দুদকে জমা দিতে বলা হয়। দুদক সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলো থেকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্যবিবরণী পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংস্থাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকে প্রায় এক সপ্তাহ আগে দুদকের পাঠানো চিঠি পৌঁছেছে। মতিঝিল, দিলকুশা ও লোকাল অফিস শাখা থেকে বসুন্ধরা ও যমুনা গ্রুপ-সংক্রান্ত তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে পাঠানোর কাজ চলছে।’
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যাংকঋণ গ্রহণের সময় ব্যাংকে জমা দেওয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল মুনাফা দেখানো হয়েছে। বিপরীতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেওয়া প্রতিবেদনে লোকসান উল্লেখ করা হয়েছে। আবার যৌথ মূলধন কোম্পানিতে জমা দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদনে সীমিত মুনাফা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসান দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে দুদক। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে ওই পাঁচ শিল্পগোষ্ঠীর ৬২টি ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন তলব করা হয়েছে।
দুদক বসুন্ধরা গ্রুপের ২০টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন তলব করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান হলো— বসুন্ধরা সিটি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, ইস্ট ওয়েস্ট প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, মেঘনা সিমেন্ট মিলস লিমিটেড, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড, বসুন্ধরা স্টিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স লিমিটেড, বসুন্ধরা স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, বসুন্ধরা লজিস্টিকস লিমিটেড, বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন, বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টার, বসুন্ধরা ড্রেজিং কোম্পানি লিমিটেড, বসুন্ধরা টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, বসুন্ধরা টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক লিমিটেড, বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সুন্দরবন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স লিমিটেড, বসুন্ধরা সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বসুন্ধরা কিংস, কেবাব তুর্কি বাবা রাফি (বাংলাদেশ) এবং মেঘনা সিমেন্ট মিলস লিমিটেড। দুদক সূত্র জানায়, পর্যায়ক্রমে গ্রুপটির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যও তলব করা হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবু তৈয়ব-এর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর মিডিয়া দেখছি না। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে আগ্রহী নই।’ এদিকে অন্য শিল্পগোষ্ঠী যমুনা গ্রুপ-এর কমার্শিয়াল ডিরেক্টর শামসুল হাসান বলেন, ‘দুদকের চিঠির বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। তবে আমাদের যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া জে ডব্লিউ মেরিয়ট-এর সঙ্গে এখনো কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শেয়ারবাজারেও আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এরপরও দুদক যদি আর্থিক প্রতিবেদন চেয়ে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।’
যমুনা গ্রুপের ১৬ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এগুলো হলো যমুনা ফিউচার পার্ক, যমুনা টিভি, জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলস (বাংলাদেশ), ক্রাউন বেভারেজ, যমুনা নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমেটেড, যমুনা ডেনিমস লিমিটেড, যমুনা স্পিনিং মিলস লিমিটেড, শামীম স্পিনিং মিলস লিমিটেড, শামীম কম্পোজিট মিলস লিমিটেড, শামীম রোটর স্পিনিং লিমিটেড, যমুনা সিটি, নিউ উত্তরা মডেল টাউন, পেগাসাস লেদারস লিমিটেড, যমুনা ডিস্টিলারি লিমেিটড, যমুনা ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড লিমিটেড ও যমুনা ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড অটোমোবাইলস।
হা-মীম গ্রুপের ডেনিম মিল, সোয়েটার ফ্যাক্টরি, এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং ফ্যাক্টরি, কার্টন ফ্যাক্টরি, পলি ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রি, লেবেল ফ্যাক্টরি, পাটকল, কেমিক্যাল ফর্মুলেশন প্ল্যান্ট, চা বাগান এবং ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
ম্যাক্স গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন চেয়েছে দুদক। এগুলো হলো ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কুশিয়ারা পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড, ম্যাক্স পাওয়ার লিমিটেড, ম্যাক্স ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ম্যাক্সিনক্স লিমিটেড, ম্যাক্স এসসিআইসিওএসও লিমিটেড, ম্যাক্স বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেড, ম্যাক্স প্রি-স্ট্রেস লিমিটেড, লুব হাউস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও এএফএ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
** ১০ শিল্পগোষ্ঠীর ১৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার জব্দ
** বিলিয়ন ডলার শিল্পগোষ্ঠীর ফাঁকি রোধ চায় ফিকি
** মেঘনা গ্রুপের এক লাখ কোটি টাকা পাচার
** করফাঁকির তদন্ত: সাত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত
** আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের ২৮ কোটি টাকা বিদেশে পাচার
** ১০১ অর্থ পাচারকারী শনাক্ত, ২০০ কোটি করে পাচার
** সাত ব্যক্তি-২ প্রতিষ্ঠান পাচার করেছে ১০১ কোটি টাকা
** রপ্তানির ছলে ১৫০০ কোটি টাকা পাচার
** পাচারের টাকায় বিদেশে ‘কামাল পরিবারের’ সাম্রাজ্য
** লোপাটের ৬১৬ কোটি টাকা কানাডায় পাচার
** পাচারের টাকায় ৮ গ্রুপের বৈশ্বিক সাম্রাজ্য
** পাচারের টাকায় দুবাইয়ে বাপবেটার অট্টালিকা
** ইনকামিং কল: দুই প্রতিষ্ঠানের পাচার ৮০০ কোটি টাকা
