** বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় ও এক্সেসরিজ কাঁচামাল সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করছে বহু প্রতিষ্ঠান
** কাপড় ও এক্সেসরিজের কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করেনি-এমন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখতে এনবিআর থেকে তালিকা সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলকে পাঠিয়েছে এনবিআর
** বেশিরভাগ কর অঞ্চল আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে তার বিস্তারিত বিবরণ এনবিআরকে পাঠিয়েছে
** কাপড়, এক্সেসরিজ, আর্টিফিশিয়াল লেদার, কেমিক্যাল বন্ড সুবিধায় আমদানি করে তা বিক্রি করে একদিকে রাজস্ব ফাঁকি দেয়, অন্যদিকে টাকা পাচার করে
** মেশিনারিজ নেই, অথচ বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল বিক্রি করে ভুয়া রপ্তানি দেখায়-এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে
রপ্তানিকে উৎসাহ দিতে পোশাক, এক্সেসরিজসহ কয়েকটি খাতে সরকার বন্ড সুবিধা দিয়েছে। এছাড়া রপ্তানির মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে-সেজন্য শুল্কমুক্ত বা বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাপড়, এক্সেসরিজ, কেমিক্যাল, আর্টিফিশিয়াল লেদারসহ অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি করে না। শুল্ককর ফাঁকি দিতে তা সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভুয়া রপ্তানি দেখায়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করলেও টাকা দেশে আনেন না। কিছু প্রতিষ্ঠান অডিটের আগে বিপুল পরিমাণ কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানকে শেষে কিছুই করতে পারে না সরকার বা এনবিআর।
তবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করা প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি খতিয়ে দেখা শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেজন্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে কয়েকটি কর অঞ্চলকে তা খতিয়ে দেখতে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কর অঞ্চল থেকে যাচাই করে প্রতিবেদন এনবিআরে পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। যেই প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহ হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি, খোলাবাজারে বিক্রিসহ যাবতীয় তথ্য যাচাই করা হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ব্যাংক লেনদেনের তথ্য কাস্টমসের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমসহ অন্যান্য ডেটাবেজে থাকা আমদানি ও রপ্তানি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে, যাতে কোনো অমিল বা অসঙ্গতি ধরা পড়ে। একই সঙ্গে, বন্ড কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে বা ১ জানুয়ারি থেকেই সব ধরনের ম্যানুয়াল ইউটিলিটি পারমিট (ইউপি) বাতিল করা হয়েছে, ফলে বন্ড সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে ডিজিটাল কমপ্ল্যায়েন্স বাধ্যতামূলক হচ্ছে। এখন থেকে কাঁচামালের এনটাইটলমেন্ট বা ইউটিলিটি পারমিশনসহ সব বন্ড সেবা কেবল কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিবিএমএস)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কর্মকর্তারা জানান, সিবিএমএস বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমসের ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় নজরদারি, অডিট এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ অনেক শক্তিশালী হবে।
এনবিআর সূত্রমতে, দেশে প্রায় ৬ হাজার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স রয়েছে, যারা শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করতে পারে। বন্ড সুবিধার কথিত অপব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন দেশের টেক্সটাইল মিল মালিকরা। এই শিল্পখাতের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, শুল্কমুক্ত আমদানি করা পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা এবং সরাসরি চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাজারে আসছে, যা স্থানীয় উৎপাদকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। গার্মেন্টস এক্সেসরিজসহ অন্যান্য পণ্যও এ অপব্যবহারের আওতায় পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর এনবিআর দুইভাগ করা নিয়ে সৃ্ষ্ট প্রশাসনিক জটিলতায় মাঠ পর্যায়ে তদারকিতে ভাটা পড়ায় এই সময়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় শিল্প মালিকদের।
সূত্র আরও জানায়, এনবিআর থেকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা শতাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে কর অঞ্চলগুলোতে পাঠানো হয়েছে। কর অঞ্চলগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখছে।
ঢাকার একটি কর অঞ্চলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে ব্যাংকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের, অর্থাৎ কয়েক কোটি টাকা বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের সন্দেহ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত করে তাদের তথ্য চেয়ে ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকের কাছ থেকে তাদের গত ৫ বছরের লেনদেনের তথ্য পাওয়ার পর কাস্টমসের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা-তে রক্ষিত তথ্যের সঙ্গে তা ক্রসচেক করা হবে। তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে, এর ব্যাখ্যা চাওয়া হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। রপ্তানির তথ্যের তুলনায় ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে লেনদেনের পরিমাণ বেশি হলে, এবং এর যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে ধরে নেওয়া হবে, শুল্কমুক্ত সুবিধার কাঁচামাল বাইরে (স্থানীয় বাজারে) বিক্রি করা হয়েছে। প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবও যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।’
অপর একটি কর অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অন্যান্য কর অফিস মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১০০ এর মত হবে। তবে দুই কর অফিসই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নামের তথ্য জানাতে রাজি হয়নি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গত মাসে এনবিআরের সঙ্গে এক বৈঠকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অন্তত একজন অপরাধীকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হোক, কারণ তাদের কর্মকাণ্ড সৎ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। আমরা জানতে চাই, কারা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে।
** ওলিরা ফ্যাশন: বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে ২৬ কোটি ফাঁকি
** ‘ফ্রেশ সুগারের’ বন্ড সুবিধার অপব্যবহার
** ‘সিটি সুগারের’ বন্ড সুবিধার অপব্যবহার থামছে না
** হৃদয় গ্রুপের বন্ড সুবিধার অপব্যবহার
** আনোয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধার অপব্যবহার
** বন্ধ প্রতিষ্ঠানের ২৪৫ টন বন্ডের কাপড় খালাসের চেষ্টা
** সেই রাফায়েতের ২৫৯৫ টন কাপড় খুঁজে পায়নি বন্ড
** বন্ডের ৪৯২৭ টন কাপড়ের ৩৭৯৭ টন-ই বিক্রি করে দিয়েছে!
** ১৪৫ টন বন্ডের কাপড় গোডাউনে ঢুকেনি, সড়ক থেকে ‘হাওয়া’
** ‘বন্ডের পণ্য বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’
** টেরিবাজারে জাহাজ থেকে খালাস হয় বন্ডের কাঁচামাল!
** বন্ড দুর্নীতিতে বছরে ৫শ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
** তিন গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ
** নেত্রকোনা এক্সেসরিজের ৫ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
** রপ্তানি না করেও পাচ্ছে প্রাপ্যতা-ইউপি, বিক্রি করে এলসি
** প্রাপ্যতা জালিয়াতি, এমডি-চেয়ারম্যানের নামে মামলা
** ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে মিলবে বন্ড সুবিধা
** ‘ট্রেজারি বন্ডের ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে’
** বন্ড লাইসেন্স না থাকলেও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ
** বন্ড অফিসে বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
** এইচএস কোডের চার ডিজিট মিল থাকলে খালাস করতে হবে
** এইচএস কোড ভিন্ন হলেও পণ্য খালাসে জটিলতা নেই
** এইচএস কোডের ভুলে ৪০০% জরিমানা, ব্যবসায়ীরা হয়রানি হচ্ছেন: ডিসিসিআই
** এইচএস কোড পাল্টে পণ্য খালাস নেয় বার্জার পেইন্টস
** বন্ড ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেবে এনবিআর
** ১৪৫ টন বন্ডের কাপড় গোডাউনে ঢুকেনি, সড়ক থেকে ‘হাওয়া’
** কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দিতে চায় এনবিআর
** ‘প্রাপ্যতার সুযোগে’ বন্ডের এক্সেসরিজ খোলাবাজারে
** অনলাইনে মিলছে ‘বন্ড লাইসেন্স’
** তুলা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা
** ইপিজেডের বন্ড সুবিধার ১০৭ টন কাপড় চট্টগ্রামে আটক
** আনোয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধার অপব্যবহার
** ‘বন্ডের পণ্য বাজারে বিক্রি করলেই লাইসেন্স বাতিল’
** ৩০১ টন বন্ডের কাঁচামাল গায়েব করেছে ‘জেএফকে ফ্যাশন’
** অনুমোদন পেলো ‘ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট’

