লোকসানি সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদর আকাশচুম্বী

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত শেয়ারগুলোর একটি সোনারগাঁও টেক্সটাইল। দীর্ঘদিন ধরে কারসাজির সন্দেহে থাকা দুর্বল মৌলভিত্তির এই বস্ত্র খাতের কোম্পানিটির শেয়ারদর গত দুই বছরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে। এ সময়ে শেয়ারটির মূল্য প্রায় ২৫৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত সাত সপ্তাহে এর দরবৃদ্ধির গতি আরও বেশি অস্বাভাবিক ছিল।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ জুলাই শেয়ারটির সমাপনী দর ছিল ২৭ টাকা ২০ পয়সা। ২০২৬ সালের ২ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ টাকা ২০ পয়সায়। অর্থাৎ দুই বছরে শেয়ারটির দর সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। আর গত ১০ মে শেয়ারটির দর ছিল ৩৩ টাকা ৯০ পয়সা। সেই হিসেবে দুই মাসেরও কম সময়ে দর বেড়েছে প্রায় ১৮৪ শতাংশ। গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে শেয়ারদরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির তদন্তের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তারপরও ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।

দর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে শেয়ারটির সর্বনিম্ন মূল্য ছিল ১৭ টাকা ৭০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ৯৬ টাকা ৭০ পয়সা। গত ৩০ কার্যদিবসে এর দর বেড়েছে প্রায় ১৪০ শতাংশ এবং ৯০ কার্যদিবসে বৃদ্ধি ২০০ শতাংশেরও বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অস্বাভাবিক উত্থান সাধারণত বাড়তি চাহিদা, জল্পনা-কল্পনা কিংবা সম্ভাব্য কারসাজির ইঙ্গিত দেয়। তবে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সোনারগাঁও টেক্সটাইল লোকসানের মধ্যে রয়েছে এবং এর সঞ্চিত লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে টানা পাঁচ বছর কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ অবস্থায় ২০১৮ সালে বিএসইসি কোম্পানিটির কার্যক্রম পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়। পরবর্তী বছরে সাময়িকভাবে মুনাফায় ফিরলেও তা টেকসই হয়নি; পরের অর্থবছরেই প্রায় ৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা নিট লোকসান গুনতে হয়।

স্পিনিং শিল্পের উত্থানের সময়ে যাত্রা

দেশীয় ও রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে সুতার চাহিদা বাড়তে থাকায় ১৯৮৫ সালে সোনারগাঁও টেক্সটাইলস প্রতিষ্ঠিত হয়। খান সন্স গ্রুপের উদ্যোগে এবং তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯২ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। শুরুতে বিভিন্ন কাউন্টের সুতি ও পলিয়েস্টার সুতা উৎপাদন করত, যার প্রাথমিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৪০০ স্পিন্ডল। ১৯৯৩ সালে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ছিল ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ওই বছর বিক্রয় আয় দাঁড়ায় ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা হয় ১৫ লাখ টাকা, যা ১৯৯৪ সালে বেড়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ১৯৯৫ সালে কোম্পানিটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং পরের বছর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও তালিকাভুক্ত হয়। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) থেকে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি এবং বিনিয়োগকারীদের সামনে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য উপস্থাপন করে। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে শেয়ারপ্রতি আয় ও নগদ লভ্যাংশ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছিল।

প্রবৃদ্ধি থেকে পতনের পথে

তালিকাভুক্তির পর প্রায় দেড় দশক কোম্পানিটির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিক্রয় আয় প্রায় চার গুণ বেড়ে ৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছে। স্পিন্ডলের সংখ্যা ২৭ হাজার ৮৪০ থেকে বেড়ে ৭১ হাজারে উন্নীত হয়। কর্মসংস্থানও বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জনে পৌঁছায়। একই সময়ে রিজার্ভ ও উদ্বৃত্ত এবং শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটিতেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়। ২০১১ সালে উৎপাদন সম্প্রসারণ ও বিএমআরই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কোম্পানিটি ১:১ অনুপাতে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে প্রায় ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু সেই সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত সুফল আনতে পারেনি। ২০১২ সালের পর থেকে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসান, লভ্যাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ঋণচাপ বৃদ্ধি কোম্পানিটিকে দুর্বল করে তোলে। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাময়িকভাবে মুনাফায় ফিরেছিল, পরবর্তী বছরেই আবার বড় ধরনের লোকসানে পড়ে।

সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্র

সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও কোম্পানিটি লোকসান থেকে বের হতে পারেনি। বিক্রয় আয় বেড়ে ৩২ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় পৌঁছালেও উৎপাদন ব্যয় বেশি থাকায় প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকার মোট লোকসান এবং ২ কোটি ১২ লাখ টাকার নিট লোকসান হয়েছে। ফলে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮০ পয়সা। কোম্পানিটির মোট সম্পদ ১২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা হলেও দীর্ঘমেয়াদি দায় ৭৩ কোটি টাকার বেশি। প্রতি ১ টাকা ইক্যুইটির বিপরীতে ঋণ রয়েছে প্রায় ১ টাকা ৫৯ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮ টাকা ৩৫ পয়সায়। একই সময়ে কর্মীসংখ্যা ১ হাজার ১৪৫ জন থেকে কমে ৮০১ জনে নেমে এসেছে। সঞ্চিত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায়।

চলতি সম্পদের তুলনায় চলতি দায় বেশি হওয়ায় কোম্পানিটির কার্যকর মূলধনে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিরীক্ষকরা ‘গোয়িং কনসার্ন’ হিসেবে ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে ২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের এ কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ শেয়ার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫১ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তবে কোম্পানিটির সাম্প্রতিক শেয়ারদর বৃদ্ধির সঙ্গে এর মৌলভিত্তিক অবস্থার স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৮০ পয়সা লোকসান করেছে প্রতিষ্ঠানটি এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) নেমে এসেছে ১৮ টাকা ৩৫ পয়সায়। অথচ বাজারে শেয়ারটির লেনদেন হচ্ছে ৯০ টাকারও বেশি দরে, যা নিট সম্পদ মূল্যের প্রায় পাঁচ গুণ।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গত ১০ মে থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত সপ্তাহের ব্যবধানে শেয়ারটির দর প্রায় তিনগুণ হয়েছে। একই সময়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে এমন কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যা এই উল্লম্ফনের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। ফলে বাজারে জল্পনা-কল্পনা এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্বল মৌলভিত্তির কোনো কোম্পানির শেয়ার অল্প সময়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ে। কারণ অনেক বিনিয়োগকারী তখন কোম্পানির আর্থিক অবস্থা না দেখে কেবল দর বৃদ্ধির প্রবণতা অনুসরণ করেন। অতীতে পুঁজিবাজারে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে অস্বাভাবিকভাবে দর বৃদ্ধির পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কোম্পানির বক্তব্য

সোনারগাঁও টেক্সটাইলসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মনিরুল ইসলাম খান জানান, কোম্পানিটিকে টিকিয়ে রাখতে পরিচালনা পর্ষদ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এ সংকট শুধু সোনারগাঁও টেক্সটাইলসের নয়; দেশের অনেক স্পিনিং মিলই একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং গত কয়েক দফা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এ ব্যয় আরও বেড়েছে। পাশাপাশি সুতার বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, চাহিদা কমে যাওয়া এবং আমদানিকৃত সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতাও কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। গ্যাস সংযোগের প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভোলা থেকে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তারা। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, একদিকে টানা লোকসান, সঞ্চিত ক্ষতি, দুর্বল আর্থিক অবস্থা ও দীর্ঘদিন লভ্যাংশ না দেওয়া—অন্যদিকে অল্প সময়ের মধ্যে শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থান। এই বৈপরীত্যই সোনারগাঁও টেক্সটাইলসকে বর্তমানে পুঁজিবাজারের অন্যতম আলোচিত কোম্পানিতে পরিণত করেছে।