লুবরেফ এমডির মেয়ে হাতিয়ে নিয়েছে ৩০ কোটি টাকা

নুসরাত নাহার নামে এক নারী অভিনব উপায়ে শেয়ারবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার দ্বৈত নাগরিক এবং একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের রেসিডেন্ট কার্ডধারী। নুসরাত লুবরেফ বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএনও) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফের মেয়ে। এছাড়া তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের পুত্রবধূ। বাবা ও শ্বশুরের এই প্রভাব দেখিয়ে তিনি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বিপুল অঙ্কের অর্থ নিজের কাছে সরিয়ে নিয়েছেন।

শেয়ারবাজারে লেনদেনের জন্য ব্রোকারেজ হাউসে বেনিফিশারি ওনার্স (বিও) হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক। একটি বিও খুলতে গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থাকা প্রয়োজন। সাধারণত টাকা সরাসরি বিওতে জমা দেওয়া যায়, তবে টাকা ফেরত (ইউথড্র) নেওয়ার ক্ষেত্রে তা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। বিএসইসি রুলস ২০২০-এর বিধি ৬(১) অনুযায়ী, এই নিয়ম সব বিও হিসাবধারীর জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু ৩০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনার ক্ষেত্রে এই বিধি উলংঘন করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখায় এনআরবি ইক্যুয়িটি ম্যানেজমেন্ট নামে ব্রোকারেজ হাউসে নুসরাত নাহার ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে একটি বিও হিসাব খুলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে। ওই হিসাবের মাধ্যমে কখনো কোনো অর্থ জমা না থাকলেও লুবরেফ বাংলাদেশ লিমিটেডের ৮৮ লাখ ইউনিট শেয়ার (কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৬.০৬ শতাংশ) সেখানে জমা হয়। ফেস ভ্যালুতে শেয়ারের মূল্য ছিল ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি হিসেবে তিনি বিদেশ থেকে ওই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এনেছেন—এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া তিনি প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট হিসেবে ৮৮ লাখ শেয়ার কিনে থাকলে ওই অর্থ কোম্পানিকে পরিশোধ করেছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো শেয়ার-সংশ্লিষ্ট পক্ষ ডকুমেন্ট দেখাতে পারেননি।

রাজধানীর বাংলামটরে অবস্থিত বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেডের নামে সাউথইস্ট ব্যাংকে পরিচালিত হিসাব ব্যবহার করে নুসরাত নাহার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। নুসরাতের ওই ব্যাংকে কোনো নিজস্ব হিসাব না থাকলেও, তিনি নিজের নামে থাকা বিও হিসাব দেখিয়ে কোম্পানির ব্যাংক হিসাব থেকে লেনদেন সম্পন্ন করেছেন। নুসরাতের নামে থাকা বিও হিসাবের মাধ্যমে কোনো নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ জমা দিয়ে শেয়ার ক্রয় করা হয়নি। তবে সাউথইস্ট ব্যাংকের কোম্পানির (বিএলআই ক্যাপিটাল) হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার শেয়ার নুসরাতের নামে ক্রয় করা হয়েছে, যেটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে করা হয়। ২০১৭ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের বিভিন্ন সময়ে এই পে-অর্ডার ইস্যু করে শেয়ার ক্রয় করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নুসরাতের নামে বিভিন্ন উৎস থেকে ‘বেনামি’ অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা ঋণের কাহিনিও রয়েছে। পে-অর্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করা শেয়ার বিক্রি করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা সহ মোট ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নুসরাতের নামে থাকা বিও হিসাব থেকে অধিকাংশ নগদ অর্থ উত্তোলন করেছেন মো. আব্দুল খালেক নামে এক ব্যক্তি। খালেকের নামে সাউথইস্ট ব্যাংকের করপোরেট শাখায় একটি হিসাব রয়েছে। বিএসইসি রুলস ২০২০-এর বিধি নং-৬(১) অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের বিও হিসাব থেকে নগদ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও নগদ উত্তোলনের সুযোগ নেই। তবে এই বিধি লঙ্ঘন করে বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেড থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২ কোটি টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়েছে।

মূলত বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেড ও বিএলআই লিজিং নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সাউথ-ইস্ট ব্যাংক থেকে ঋণ ইস্যু করে ওই টাকা দিয়ে নুসরাত নাহারের নামে শেয়ার ইস্যু দেখিয়ে লুটপাট হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সার্বিকভাবে রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, নুসরাত নাহারের নামে বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেডের পরিচালিত বিও হিসাবে জমা হওয়া ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা তিনি নিজে প্রদান করেননি। এমনকি ওই বিও হিসাবটি থেকে মোট উত্তোলন করা প্রায় ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি। অর্থাৎ পুরো টাকাই পাচার হয়ে গেছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

অর্থাৎ নুসরাত নাহারের নামে দুটি বিও হিসাবে ৩০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ প্রবাহিত হয়েছে, যার উৎস অজ্ঞাত। নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না খুলে ব্রোকারেজ বা তৃতীয় পক্ষের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। যেখান থেকে ৮৮ লাখ ইউনিট আইপিও শেয়ার ক্রয় করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে এসব অনিয়ম চললেও ব্রোকারেজ হাউসের অডিটররা বিষয়টি চিহ্নিত করেননি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নুসরাতের শ্বশুর আলমগীর কবির সে সময় ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকায় নুসরাতের কোনো ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব না থাকলেও ব্যাংকের করপোরেট ও অন্যান্য হিসাব থেকে তার নামে পে-অর্ডার ইস্যু করা সম্ভব হয়েছে। অথচ কেওয়াইসি ও ব্যাংক হিসাব নীতিমালা এবং সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী নিজস্ব ব্যাংক হিসাব ছাড়া কোনো বিও হিসাব খোলা বা পরিচালনার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে নুসরাতের কোনো ব্যাংক হিসাব না থাকলেও তাকে লেনদেনের সুযোগ দিয়ে বিএলআই ক্যাপিটাল ব্রোকারেজ হাউসের লাইসেন্সিং শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এদিকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী বৈধ উৎস ছাড়া বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর এবং তা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে পাঠানো গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য নুসরাত নাহার বর্তমানে দেশে অবস্থান না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার বাবা বিএনওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফকে একাধিকবার ফোন করলেও ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা দিলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনওর তৎকালীন সিএফও মফিজুল ইসলাম বর্তমানে চাকরিতে নেই। কোম্পানি সেক্রেটারি কবির হোসেনকে ফোন দিলে তিনিও ধরেননি।

This will close in 5 seconds