রোজা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর কাঁচাবাজারে ফল, সবজি, খেজুর, ছোলা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এতে ভোক্তারা বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সমস্যায় পড়েছেন। ভোক্তাদের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় রমজান শুরু হওয়ায় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এদিকে, ইফতারের শরবত তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ লেবুর দাম এখন ‘সেঞ্চুরি’ স্পর্শ করেছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর লালবাগ, নিউমার্কেট ও আজিমপুর এলাকার কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বড় লেবুর দাম হালিতে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ১১০–১২০ টাকায় পৌঁছেছে।
দুই সপ্তাহ আগে বড় লেবুর হালি ছিল ৭০–৮০ টাকার মধ্যে, আর মাঝারি লেবুর দাম ছিল ৫০–৬০ টাকা, তবে এখন মাঝারি লেবু হালি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। লালবাগের সবজি ব্যবসায়ী মামুন মিয়া বলেন, বর্তমানে লেবুর মৌসুম পুরোপুরি নেই; গাছে নতুন ফুল ও ছোট ফল ধরায় সরবরাহ কমে গেছে। যেসব গাছে সারাবছর কিছু লেবু পাওয়া যায়, সেই ফলই বর্তমানে বাজারে আসছে। সরবরাহ কম থাকার কারণে দাম বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের কারণে গত কয়েকদিন পরিবহন চলাচল সীমিত থাকায় বাজারে পণ্য সময়মতো পৌঁছায়নি, যার প্রভাব দামের ওপর পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এটি সাময়িক পরিস্থিতি—মৌসুম শুরু হলে দাম আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। নিউমার্কেটে বাজার করতে আসা গৃহিণী শাহিদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুনি অন্যান্য দেশে রমজান আসতে শুরু করলে দাম কমে যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। দুই দিন গাড়ি একটু কম চলছে দেখেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সুযোগ খোঁজে কখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে দাম বাড়াতে পারে।
এদিকে শীতের শেষ মৌসুমে অধিকাংশ সবজির দাম বেড়েছে। পেঁপে আগে ২৫ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। করলা ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। ঢেঁড়স ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে। গোল বেগুন ৮০ টাকা এবং শসা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানে জনপ্রিয় ইফতারি ‘বেগুনি’ তৈরিতে ব্যবহৃত লম্বা বেগুনের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে এখন ৬০ টাকা, যা আগে ছিল ৫০ টাকা।
অন্যদিকে, লাউয়ের দাম কমে ৬০ টাকা থেকে ৫০ টাকায় নেমেছে এবং টমেটোও ৬০ টাকা থেকে কমে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর দাম কেজিতে ২০ টাকা, ফুলকপি ৩০ টাকা এবং শিম ৪০–৬০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে গরুর মাংস ও মুরগির দাম বেড়েছে; সোনালী মুরগি আগের ৩৩০ টাকার পরিবর্তে এখন ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৯০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, আর গরুর মাংস ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫০ টাকায় পৌঁছেছে। মাছের মধ্যে রুই, শিং, কই ও পাবদার দাম কেজিতে ২০–৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্য মাছের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। একদিন আগে ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি রসুন ৯০–১০০ টাকার মধ্যে থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে, আর চায়না রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। আদার বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—চায়না আদা ১৬০ টাকা এবং দেশি আদা ১৩০–১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খেসারির ডালের দাম বেড়েছে; আগে এটি ৮৫–৯০ টাকার মধ্যে থাকলেও এখন ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য ডালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে—মুগ ডাল ১৫৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা এবং ছোলা ৯০ টাকায়। চিনি ১০০ টাকা, বেসন ৮০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ইসবগুলের ভুষি ১০০ গ্রাম ১৫০ টাকা এবং ডাবলি বুট ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। পোলাওয়ের চালের দামও বেড়েছে; আগে ১৩৫ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়, অন্য চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। মিনিকেট চাল ৮০ টাকা, আটাশ চাল ৬০ টাকা এবং পায়জাম চাল ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্যতেলের মধ্যে খোলা সয়াবিন তেল ২০০ টাকা এবং খোলা সরিষার তেল ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন প্রকার খেজুরের দাম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রমজানে খেজুরের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ডিসেম্বর খেজুর আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল, যাতে আমদানি বেড়ে দাম কমার আশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে দাম উল্টো বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে কম দামে জাহিদী খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়, এক সপ্তাহ আগেও এটি ছিল প্রায় ২৫০ টাকা। অন্য খেজুরের মধ্যে বড়ই ৪৮০–৫০০ টাকা, দাবাস ৫০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০–১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০–১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০–১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বৃদ্ধি হয়েছে দাবাস ও কালমি জাতের; দাবাসের দাম ৫০ টাকা বেড়ে ৪৫০–৫০০ টাকা এবং কালমি ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকায় পৌঁছেছে।
রমজান শুরুর কয়েক দিন বাকি থাকতেই নানা অজুহাতে বিভিন্ন ফলের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, নির্বাচন ও রমজানের কারণে চাহিদা বাড়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আপেলের দাম কেজিতে ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা, কমলা ২৪০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সাদা আঙুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থান ও আকারভেদে দামে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
