** জানুয়ারি ২০১৭ থেকে জুন ২০১৯ মোট ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে
** পাঁচ বছরে কেনাকাটা বা ব্যয়ের ওপরও সঠিকভাবে ভ্যাট দেয়নি প্রাইম ব্যাংক
** ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে ব্যাংক, হবে সুদ আরোপ ও জরিমানা
বিদেশ থেকে আসা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ওপর কোনো কর নেই। তবে রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রাইম ব্যাংকের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের তদন্তে দেখা গেছে, কেনাকাটা ও অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বেসরকারি খাতের এই ব্যাংকটি যথাযথভাবে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। গত পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকটিকে শোকজ নোটিশসহ দাবিনামা জারি করা হলে প্রাইম ব্যাংক ভ্যাট পরিশোধের কথা জানিয়েছে। তবে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের ওপর সুদ ও জরিমানা আরোপ করবে এনবিআর।
সূত্র জানায়, প্রাইম ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে রেমিট্যান্সের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) তদন্ত শুরু করে এবং প্রাইম ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পায়। ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট আদায়ের জন্য ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-এর কাছে প্রতিবেদন পাঠায় সিআইসি। পরবর্তীতে এলটিইউর মূল্য সংযোজন কর শাখা থেকে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। এলটিইউর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়কে দুই ভাগে ভাগ করে মোট অপরিশোধিত ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ১ কোটি ৭৬ লাখ ৫৭ হাজার ৯২৩ টাকা এবং ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ২ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার ৮২৪ টাকা ভ্যাট ফাঁকি ধরা পড়ে। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে প্রাইম ব্যাংকের মোট অপরিশোধিত ভ্যাট দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮ হাজার ৭৪৮ টাকা।
প্রতিবেদনের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, আড়াই বছরে প্রাইম ব্যাংকের মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্সের তথ্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম থেকে পাওয়া নথিপত্র যাচাই করে সিআইসির কর্মকর্তারা দেখতে পান—প্রাইম ব্যাংক ওই সময়ে রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রযোজ্য ১ কোটি ৭৬ লাখ ৫৭ হাজার ৯২৩ টাকা উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এই ভ্যাট আদায়ের জন্য ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মূসক আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৫৫(১) অনুযায়ী দাবিনামাসহ কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে এলটিইউ। পরবর্তীতে ১৬ নভেম্বর ব্যাংকটির কর্মকর্তারা শুনানিতে অংশ নিয়ে এলটিইউকে জানান, রেমিট্যান্সের বিপরীতে দাবি করা মোট ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮ হাজার ৭৪৮ টাকার মধ্যে কিছু অংশ ২০২৩ সালের মার্চ কর মেয়াদের ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়েছে। এছাড়া বাকি ২ কোটি ৪০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪০ টাকা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং পদ্মা ওয়েল কোং লিমিটেডের মাধ্যমে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
দ্বিতীয় অংশের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত অডিট ফার্মের মাধ্যমে প্রাইম ব্যাংক রেমিট্যান্সের কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, ব্যাংকটি ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত আড়াই বছরে ২ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার ৮২৪ টাকা প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। ফাঁকি দেওয়া এই ভ্যাট আদায়ে সিআইসি থেকে ২৪ আগস্ট এলটিইউকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ভ্যাট পরিশোধে এলটিইউ থেকে প্রাইম ব্যাংককে ১৮ সেপ্টেম্বর মূসক আইন, ২০১২ অনুযায়ী দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়।
এনবিআর সূত্রমতে, প্রাইম ব্যাংক এই দুটি দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে জানায়, এই ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট ব্যাংক ফাঁকি দিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার অর্থ হলো ব্যাংক ফাঁকি স্বীকার করেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইসির আনীত অভিযোগ ও দাবিনামা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সেজন্য ব্যাংককে পৃথকভাবে ফাঁকি দেওয়া এই ভ্যাটের ওপর সুদ ও জরিমানা দিতে হবে। এর জন্য এলটিইউ থেকে নোটিশ জারি করা হবে।
এদিকে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি কেনাকাটা ও বিভিন্ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও যথাযথভাবে উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির নিরীক্ষা পরিচালনা করে। নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে কেনাকাটা ও ব্যয়ের ওপর মোট ২০ লাখ ৭০ হাজার টাকার উৎসে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি, ফলে এই অর্থ ভ্যাট ফাঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ভ্যাট আদায়ের জন্য সম্প্রতি এলটিইউ থেকে দাবিনামাসহ কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রাইম ব্যাংক পিএলসির সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বক্তব্য পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
