চট্টগ্রামের কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকার রিলায়েন্স ক্যান ইন্ডাস্ট্রিজ (প্রাইভেট) লিমিটেডের বিরুদ্ধে গত পাঁচ অর্থবছরে বিপুল কর ফাঁকির অভিযোগে তদন্তে নেমে চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানের দাখিলকৃত নথি ও সিএ রিপোর্ট পর্যালোচনায় এই তথ্য উঠে আসে এবং বকেয়া রাজস্বের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী সুদ আদায়েরও সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকরামুল হোসাইন দাবি করেছেন, তারা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করেন, তাই ভ্যাট ফাঁকির কোনো সুযোগ নেই।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে রিলায়েন্স ক্যান ইন্ডাস্ট্রিজ এই কর ফাঁকি দিয়েছে। কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি এ নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। রিলায়েন্স কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে শুনানি শেষে প্রতিবেদনটি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে চট্টগ্রাম এনবিআরের এক রাজস্ব কর্মকর্তা জানিয়েছেন। একই সময়ে পরিহার করা মোট ২ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭৮ টাকা আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর নির্ধারণী নোটিশ জারির সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাখিলকৃত মূসক ৬.১ ও সিএ রিপোর্টের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯-২০২০ থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের তথ্য গোপন করা হয়েছে। এর ফলে ১ কোটি ২ লাখ ৮১ হাজার ৪০৯.৮৩ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সিএ রিপোর্টে উপকরণের ব্যবহারের পরিমাণ ৭ কোটি ৩৭ লাখ ৫৫ হাজার ২৭৭ টাকা; কিন্তু মূসক ৬.১ এ উপকরণের ব্যবহারের পরিমাণ ৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার ২২৪ টাকা।
সি এ রিপোর্টের তুলনায় রিলায়েন্স ক্যান ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃক দাখিলকৃত মূসক ৬.১ ফরমে উপকরণের ব্যবহার ২৪ লাখ ৯০ হাজার ৫২ টাকায় কম দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি এই পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি পণ্য মূসক ৯.১-এ প্রদর্শন না করে বিক্রি করেছে। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী উপকরণের ব্যবহার ১৩ কোটি ২১ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৩ টাকা হলেও মূসক ৬.১-এ তা ৮ কোটি ৮৭ লাখ ২৫ হাজার ৪৫৪ টাকা দেখানো হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এই অর্থের ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ১৪৮ টাকার উপকরণ ব্যবহার কম দেখিয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ১৪৮ টাকার উপকরণ ব্যবহার করে তৈরীকৃত পণ্য মূসক ৯.১-এ প্রদর্শন না করে বিক্রয় করেন এবং প্রতিষ্ঠানটি ২০২১-২০২২ অর্থবছরে সিএ রিপোর্টে উপকরণ ব্যবহারের পরিমাণ দেখিয়েছে ২২ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ১৭ টাকা; কিন্তু মূসক ৬.১ এ উপকরণের ব্যবহারের পরিমাণ দেখায় ২১ কোটি ৪২ লাখ ১৮ হাজার ৩৯ টাকা। সিএ রিপোর্টের তুলনায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দাখিলকৃত মূসক ৬.১ এ উপকরণ এর ব্যবহার পরিমাণ ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ৯৭৭ টাকা কম দেখায়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরীক্ষাধীন সময় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ ১৪ হাজার ৯৮৩ টাকা উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফাঁকির পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬০ টাকা। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বছরে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ২০ লাখ ৩৯ হাজার ১০৫ এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এ সময়ে ফাঁকির পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৫৮ টাকা। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সবচেয়ে কম অর্থাৎ ১১ লাখ ৪৯ হাজার ৬ টাকা উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। পুরো নিরীক্ষা মেয়াদে (২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২০২৩) প্রতিষ্ঠানটি সর্বমোট ৯৬ লাখ ৬ হাজার ২১৫ টাকা উৎসে ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি।
২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে মাসিক দাখিলপত্র (মূসক-৯.১) এবং সিএ রিপোর্টে দেখানো বিক্রয় মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। এখানে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের পরিমাণ ২৬ লাখ ৬১ হাজার ৯৫২ টাকা। নিরীক্ষা মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট বা ভিডিএস সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত অপরিশোধিত উৎসে ভ্যাটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ লাখ ৬ হাজার ২১৫ টাকা। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত মোট ২ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার বেশি।
মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১ এবং ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী এই ফাঁকি উদঘাটিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি যদি কোনো তথ্য গোপন করে থাকে বা ভুল তথ্য সরবরাহ করে থাকে, তবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রিলায়েন্স ক্যান ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিক্রয় মূল্যের গরমিলের মূল কারণ ছিল প্রতিষ্ঠানের মাসিক ভ্যাট দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) প্রকৃত বিক্রয়ের তুলনায় কম বিক্রয় মূল্য প্রদর্শন করা।
নিরীক্ষাকালে দেখা যায় যে, সিএ ফার্ম কর্তৃক প্রস্তুতকৃত অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট বিক্রয় মূল্য ছিল ১৩ কোটি ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪১ টাকা; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তাদের মাসিক দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) বিক্রয় দেখিয়েছিল মাত্র ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি তাদের দাখিলপত্রে সিএ রিপোর্টের তুলনায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫১ টাকা কম বিক্রয় মূল্য দেখিয়েছিল। এই কম বিক্রয় মূল্য দেখানোর ফলে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ লাখ ৬১ হাজার ৯৫২ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাখিলকৃত মূসক ৬.১ রেজিস্টার এবং সিএ রিপোর্টের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই তিন অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ উপকরণ ব্যবহারের তথ্য গোপন করা হয়েছে। এই অপ্রদর্শিত উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ওপর মোট ১ কোটি ২ লাখ ৮১ হাজার ৪০৯ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষা মেয়াদে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি। তবে ফাঁকি দেওয়া মোট ২ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭৮ টাকার আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কর নির্ধারণী ও কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির সুপারিশ করা হয়েছে।
** বিক্রি গোপন, সই জালিয়াতি, ৮.৫০ কোটি ভ্যাট ফাঁকি
** ভ্যাট ফাঁকি হ্রাস ও কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে টাস্কফোর্স গঠন
** উৎসে ভ্যাট ফাঁকি ও অবৈধ রেয়াত নেয় ব্র্যাক ব্যাংক
** ভ্যাট ফাঁকি-অবৈধ রেয়াত নেয় ইন্টারকন্টিনেন্টাল
** ১২৬ প্রতিষ্ঠানের ১,৫৮৬ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি
** ১৮ হাজার কোটি ভ্যাট ফাঁকি দেয় হোটেল-রেস্তোরাঁ
** ‘স্যামসাংয়ের’ ভ্যাট ফাঁকি ১৬২ কোটি টাকা
** পাঁচ মহাসড়কে ৭০ রেস্টুরেন্ট, ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ হচ্ছে
** ২৭৫ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকিতে ১০ কোটিতে রফা
** ১৫ বিমা কোম্পানির ৫৯ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
** এএফসি এগ্রোর ৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি
** তথ্য গোপন করে প্রিমিয়ার সিমেন্টের ভ্যাট ফাঁকি
** ভ্যাট ফাঁকিতে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ‘দারাজ’
** ‘ওয়ার্টসিলা বাংলাদেশ’র ২২ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি
** কাই অ্যালুমিনিয়ামের ৮.৫ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি
** ডেল্টা লাইফের সাড়ে ২৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
** ২৫,২০০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের!
** ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের ৫৮ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি
** ভ্যাট ফাঁকির ৬.৩৬ কোটি টাকা পরিশোধ করল পপুলার গ্রুপ
** ফু-ওয়াং বারের ৪১ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
** ড্যানিশ ফুডসের ৩.৪৬ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি
** ইফাদ মাল্টির ১২৫ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি
