চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), এবং এখনো সেই ধারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে রাজস্ব ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শুল্ক-কর আদায়ে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায়ে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, সেখান থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এ সময়ে জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ২১ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২৫ মার্চ) প্রকাশিত এনবিআরের হালনাগাদ তথ্য থেকে এসব জানা গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর-এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আহরণে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। বিপরীতে আহরণ হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এতে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। এই বিশাল ঘাটতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
প্রতিবেদন বলছে, এই আট মাসে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এ খাতে গত আট মাসে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। আদায়ের লক্ষ্য ছিল এ লাখ ১৮ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। এ খাতে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ। রাজস্ব আহরণে এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্ছ কম আদায় হয়েছে ভ্যাট বা মূসক খাতে। এ খাত রাজস্ব এসেছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। সেই হিসেবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ভ্যাট আদায় কম হয়েছে ২০ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তবে তুলনামূলক ভালো আদায় হয়েছে পণ্য আমদানি খাত থেকে। আলোচ্য সময়ে এ খাত থেকে শুল্কবাবদ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। তবে শুল্কখাতে তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে শুধু ফেব্রুয়ারিতে শুল্ক-করবাবদ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৫১ কোটি টাকা। তবে সংগ্রহ হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের একক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় এনবিআরকে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়। পরে তা সংশোধন করে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
এর আগের অর্থবছরের শুরুতে কোটা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আর ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে দেশের অর্থনীতি একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছিল। তাতে ওই সময় রাজস্ব আদায়েও ভাটা দেখা যায়। ওই সময় রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির দেখা মেলে। একক মাস হিসেবে জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয় ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ; অগাস্টে ১৮ দশমিক ০৩ শতাংশ আর সেপ্টেম্বরে তা দাঁড়ায় ২০ দশমিক ১৫ শতাংশে। সব মিলিয়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় বাড়ে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ।
এরপর অক্টোবরে রাজস্ব আদায়ে ধাক্কা লাগে, সে মাসে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক ৩১ শতাংশে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে কিছুটা স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও জানুয়ারিতে আবার বড় ধাক্কা আসে। ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিললেও প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ থাকে। একক মাস হিসেবে নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে সাধারণত অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায় বাড়তে দেখা যায়। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরের মাধ্যমে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে মূল বাজেটে লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাজেটে অর্থ উপদেষ্টা এনবিআরসহ সব উৎস মিলিয়ে মোট ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, যা জিডিপির ৯ শতাংশ। এর মধ্যে অন্যান্য উৎস থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল।
