রহস্যঘেরা হীরার বাজার: নেই আমদানি, বিক্রি চলছেই

বাংলাদেশে হীরার গয়নার রপ্তানি কয়েক বছর আগে বেশ সমৃদ্ধ ছিল। রপ্তানির পাশাপাশি দেশীয় চাহিদা মেটাতে আমদানিও হতো। কিন্তু গত চার বছরে হীরার আমদানি লঘুচাপের মুখে পড়ে লাখ টাকার মাত্রায় নেমেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি কমলেও দেশে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার হীরার গয়না বিক্রি হচ্ছে। দেশে কোনো হীরার খনি নেই, উৎপাদনও হয় না। তবু আমদানির অভাবে এত বড় বাজার তৈরি হওয়ায় হীরার বাণিজ্য রহস্যময় হয়ে উঠেছে। হীরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপে দুটি বিষয় উঠে এসেছে—এক, স্বর্ণের মতো শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে ভারত থেকে হীরা আসছে; দুই, ক্রেতাদের হাতে আসল হীরার বদলে পরীক্ষাগারে তৈরি নকল হীরা তুলে দেওয়া হচ্ছে। হীরার মতো দেখতে মোজানাইট ও জারকান পাথরও আসল হীরার নামেই বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশে মূল্যবান গহনার বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে স্বর্ণ। দুই দশক আগে হীরার গহনার দোকান চালু হলেও প্রাথমিকভাবে এটি সীমাবদ্ধ ছিল উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে। তবে গত পাঁচ বছরে হীরার গহনার বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রথম মসৃণ হীরা রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়। সাভারের মির্জানগরের এইচআরসি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটের ব্রিলিয়ান্ট হীরা লিমিটেড বেলজিয়ামে দেড় লাখ ডলার বা এক কোটি টাকার প্রথম চালান রপ্তানি করে। বেলজিয়াম থেকে অপ্রক্রিয়াজাত হীরা আমদানি করে দেশের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়, এবং প্রথম চালানটি পুনরায় বেলজিয়ামে রপ্তানি করা হয়। এভাবেই শুরু হয় বাংলাদেশের হীরার রপ্তানি কার্যক্রম।

ব্রিলিয়ান্টের পর রপ্তানির বাজারে নাম লেখায় রেনেসান্স জুয়েলারি বাংলাদেশ লিমিটেড। আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে ভারতীয় বিনিয়োগের এই প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়াজাত হীরা আমদানি করে নানা নকশার গয়না তৈরি করত। এসব গয়নাই রপ্তানি শুরু করে তারা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হীরা আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার দিয়েই তাদের রপ্তানি শুরু হয়। এরপর হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতে রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের হীরার গয়না রপ্তানি করে তারা।

রপ্তানির তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছিল ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। ২০১৮ সালে তাদের দুটি চালান রপ্তানি হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। দুই চালানের রপ্তানি মূল্য ছিল ৮২ হাজার ৫৩০ মার্কিন ডলার। হীরা ও হীরার গয়না রপ্তানি করে ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে। হীরা রপ্তানি হয় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। সুদিনে প্রতি মাসে ৭ থেকে ১০টি চালান রপ্তানি হতো আকাশপথে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি সপ্তাহে হীরার চালান উঠত উড়োজাহাজে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ব্রিলিয়ান্ট হীরা লিমিটেডের উদ্যোক্তাদের একজন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, রপ্তানির শুরুতে ব্রিলিয়ান্টের কারখানার নকশা (কাটিং ও পলিশিং) বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল বেলজিয়ামে। তবে হীরার ব্যবসার জন্য ব্যাংকের সহায়তা ও প্রণোদনাসহ সরকারি নীতি-সহায়তা বেশি দরকার ছিল সে সময়। সেটি পাওয়া যায়নি বলে এই কারখানা ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। হীরার বাজারে সোনালি দিন শেষ হয়ে যায় মূলত ২০১৮ সালে। ওই বছরের পর গত চার বছরে কোনো হীরার চালান রপ্তানি হয়নি।

২০১৯ সাল থেকে রহস্য শুরু

রপ্তানির পাশাপাশি সর্বশেষ হীরা আমদানি হয়েছে ২০১৮ সালে। ওই বছর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড তিন হাজার ক্যারেটের অমসৃণ হীরার দুটি চালান আমদানি করে। একই বছর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডসহ মোট দশটি প্রতিষ্ঠান ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের হীরা আমদানি করে। নয়টি চালানে আনা হীরার শুল্ক-করসহ খরচ দাঁড়ায় ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ২০০৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে হীরা ও হীরার গহনা আমদানি হয় মোট সাড়ে ৯৩ লাখ ডলার। এরপর থেকে হীরার আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গত চার বছরে হীরার আমদানি সংক্রান্ত উদাহরণ অনুযায়ী, ২০১৯ ও ২০২০ সালে শিল্প খাতে ব্যবহারের তিনটি চালান ছাড়া কোনো জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান হীরা আমদানি করেনি। ২০২১ সালে একমাত্র কাটিং ও পলিশিং কারখানা বেঙ্গল ডায়মন্ড লিমিটেড অমসৃণ হীরা আমদানি করে, আর কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড একটি ছোট চালান নিয়ে আসে। ২০২২ সালে দুটি প্রতিষ্ঠান হীরা আমদানি করেছে; শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ একটি চালান এবং ঢাকার একটি জুয়েলারি হাউস সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার ঘোষণায় আরেকটি চালান আনে। এতে চার বছরে গড়ে মাত্র সাড়ে তিন লাখ টাকার হীরা আমদানি হয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এসজিএল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহাদ কামাল লিঙ্কন, নিউ জড়োয়া হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদল রায়সহ বাংলাদেশের স্বনামধন্য স্বর্ণ ও ডায়মন্ড ব্যবসায়ীরা আমদানি না হলেও হীরার বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে দেশে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডায়মন্ডের গয়না বিক্রির শতাধিক দোকান রয়েছে। এর বাইরে স্বর্ণের দোকানেও হীরার গয়না বিক্রি হয়। এসব দোকানে বছরে কত বেচাকেনা হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশের হীরার বাজার নিয়ে সমীক্ষা করেছে এই ব্যবসায় যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের হিসাবে, হীরার গয়না বেচাকেনা হয় বছরে তিন থেকে সাত হাজার কোটি টাকার। গড় বাজার হিসাব করা হলে বছরে তা প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার।

ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে হীরা আমদানির সুযোগ নেই। তাহলে দেশের বাজারে বেচাকেনা হওয়া এত হীরা কীভাবে ও কোথায় থেকে আসছে? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় হীরা আমদানির পুরোনো তথ্যে। গত ১৯ বছরে যত হীরা আমদানি হয়েছে, তার ৮৭ শতাংশই আনা হয়েছে ভারত থেকে। ভারতের গুজরাটের সুরাটে বিশ্বের ৬৫ শতাংশের বেশি হীরা কাটিং ও পলিশিং করা হয়। খুব সহজে বহন করা যায় বলে দেশটি থেকে অবৈধভাবে হীরা আসছে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচারের সময় কয়েক বছরে কয়েকটি চালান জব্দ করেছেন। ২০২১ সালে সাতক্ষীরা সীমান্তে পৌনে দুই কোটি টাকার ১৪৪টি হীরার গয়না জব্দ করে বিজিবি। ২০১৮ সালে ৭০ লাখ টাকার হীরার গয়না জব্দ করা হয়।

অবৈধ পথে হীরা আমদানির বড় কারণ শুল্ক ফাঁকি। হীরা আমদানিতে শুল্ক–কর বেশি। যেমন বন্ড সুবিধা ছাড়া অমসৃণ হীরা আমদানিতে করভার ৮৯ শতাংশ। মসৃণ হীরা আমদানিতে করভার প্রায় ১৫১ শতাংশ। এই শুল্ক–কর ফাঁকি দিতেই মূলত হীরা অবৈধ পথে আনা হচ্ছে। গত ১৯ বছরে এই মূল্যবান রত্ন আমদানিতে সরকার মাত্র ১২ কোটি টাকার রাজস্ব পেয়েছে। হীরার বাজারে আরেকটি রহস্যজনক আচরণ হলো দেশের বাজারে দাম। দেশের বাজারে এক ক্যারেট (০.২ গ্রাম) হীরার দাম ৭৯ হাজার টাকা। আর সবচেয়ে কম অর্থাৎ শূন্য দশমিক ১০ ক্যারেট হীরার দাম ৭ হাজার ৯১৪ টাকা। বাংলাদেশে নাকফুলসহ হীরার অলংকার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকার নিচে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হীরার ক্ষুদ্র টুকরো ব্যবহার করা হলেও এত কম দামে হীরার গয়না পাওয়ার কথা নয়।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক হীরা শনাক্তকারী ল্যাব সলিটায়ার জ্যামোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড (এসজিএল) চালু হয় সাত মাস আগে। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর লন্ডন ও নিউইয়র্কে। বিক্রেতা এবং ক্রেতা দুই পক্ষই এই ল্যাবে আসল হীরা পরীক্ষা করছে। পরীক্ষায় হীরায় আসল-নকলের হার কেমন জানতে চাইলে এসজিএল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহাদ কামাল বলেন, আসল হীরা যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি নকল হীরাও মিলছে পরীক্ষায়। হীরার নামে মোজানাইট, জারকানের মতো পাথরও পাওয়া গেছে। নকল ঠেকাতে আসল হীরার গায়ে সনদ নম্বর তাঁরা খোদাই করে দিচ্ছেন, যাতে যেকোনো জায়গায় ক্রেতারা চাইলে বিক্রি করতে পারেন।

This will close in 5 seconds