সরকার রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ সহায়তা কাঠামো নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের শর্ত পূরণের কারণে রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনা ধীরে ধীরে বন্ধ করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে নগদ প্রণোদনার টেকসই বিকল্প কী হতে পারে, তা নির্ধারণের জন্য অর্থ বিভাগ গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-র বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন বিকল্প সহায়তা কাঠামো তৈরি করা, যা হবে টেকসই রপ্তানিসহায়ক। রপ্তানিকারকরা এ উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে স্বাগত জানিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি বিকল্প খোঁজার আগে কোন খাতে কেন সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
অর্থ বিভাগের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ডব্লিউটিও বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধরনের রপ্তানি-সংযুক্ত ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করতে হয়। বাংলাদেশ এলডিসি সুবিধা থেকে সরে আসায় বিদ্যমান প্রণোদনা কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। পর্যালোচনায় বলা হয়, ভবিষ্যৎ নীতি এমন হতে হবে যা একদিকে ডব্লিউটিও-সম্মত, অন্যদিকে রপ্তানির ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কার্যকরভাবে প্রশমিত করতে সক্ষম। একইসঙ্গে নতুন কোনো তহবিল বা অবকাঠামোগত সহায়তার প্রস্তাব দিলে তার রাজস্ব প্রভাব ও টেকসই অর্থায়নের উৎস স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দেরিতে হলেও সরকার বিকল্প সহায়তা কাঠামো নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে— এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। শিল্প খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে টেকসই ও কার্যকর নীতি প্রণয়ন জরুরি।’ তিনি দাবি করেন, এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখে গত দুই বছর ধরে প্রণোদনা কার্যত সীমিত রাখা হয়েছে, যার প্রভাব শিল্প খাতে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কিছুটা কমেছে।
অর্থ বিভাগের সূত্র জানায়, নগদ প্রণোদনা প্রত্যাহার বা পুনর্গঠনের প্রভাব রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় ও কর্মসংস্থানে কী হবে, তা আগেই বিশ্লেষণ করা হবে। এজন্য আনুষ্ঠানিক ইকনোমেট্রিক প্রভাব মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষণার লক্ষ্য হলো প্রমাণ ভিত্তিতে দেখা, প্রণোদনা কতটা রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, উৎপাদন ব্যয় কমিয়েছে এবং বাজার বৈচিত্র্যে ভূমিকা রেখেছে কি না। সম্ভাব্য নীতি পরিবর্তনের ফলাফল বিশ্লেষণে সিজিই (কমপিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম) মডেল ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এই মডেলে দৃশ্যপটভিত্তিক সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখা হবে, প্রণোদনা ধাপে ধাপে কমালে বা বিকল্প সহায়তা চালু করলে সামগ্রিক অর্থনীতি, খাতভিত্তিক উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্য এবং কর্মসংস্থানে কী প্রভাব পড়তে পারে। অর্থ বিভাগের মতে, তথ্যভিত্তিক এ ধরনের সিমুলেশন নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
গবেষণা উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তবে তার আগে কোন খাতে কেন প্রণোদনা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা এবং প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে হওয়া উচিত বলে তার মত। জাহিদ বলেন, ‘কোনো খাত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে কি না, প্রযুক্তি বা উৎপাদন সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে কি না— এসব বিশ্লেষণ ছাড়া সরাসরি বিকল্প খোঁজা হলে নীতিগত অসঙ্গতি থেকে যেতে পারে।’ রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তিনি নগদ প্রণোদনাকে মুখ্য উপাদান মনে করেন না। গ্যাস সংকট, বন্দর জট, পরিবহন ব্যয় ও শ্রম অসন্তোষের মতো কাঠামোগত সমস্যা সমাধান এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে ভারত ও ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ দেশগুলো উত্তরণের পরও পিছিয়ে থাকা শিল্প খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিয়েছে, তবে তা প্রয়োজননির্ভর ও সময়সীমাবদ্ধ।’
অর্থ বিভাগের পর্যালোচনায় স্পষ্ট করা হয়, বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতি ও বাজেট ঘাটতির প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো আর্থিক দায় সৃষ্টি করা যাবে না। ফলে বিকল্প সহায়তা কাঠামোর প্রস্তাবে অর্থায়নের উৎস—দেশীয় রাজস্ব, ভর্তুকির পুনর্বিন্যাস, উন্নয়ন সহযোগিতা বা অন্য কোনো উৎস—সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। নতুন তহবিল গঠনের সুপারিশ থাকলে তার ব্যবস্থাপনা কাঠামো, ব্যয়, সময়সীমা, পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া এবং প্রত্যাশিত রিটার্ন স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে নগদ প্রণোদনা বাংলাদেশের রপ্তানি নীতির একটি মূল উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পণ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর বাস্তব পরিস্থিতিতে সরাসরি ভর্তুকির পরিবর্তে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উন্নয়ন, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং বাজার বৈচিত্র্যে বিনিয়োগকে বেশি কার্যকর সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইকনোমেট্রিক মূল্যায়ন, সিজিইভিত্তিক দৃশ্যপট বিশ্লেষণ, রাজস্ব প্রভাব নিরূপণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ভবিষ্যতের রপ্তানি নীতির জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে।
