ফেনীর বিলোনিয়া স্থলবন্দর এখন মূলত নামমাত্র রপ্তানিতেই টিকে আছে। কর্মযজ্ঞ না থাকায় বন্দর জুড়ে নীরব ও সুনসান পরিবেশ বিরাজ করছে। বন্দরের লোড-আনলোড শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। যদিও এই স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি হয়, আমদানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতীয় ভিসা ইস্যুর জটিলতার কারণে যাত্রী পারাপারও কমেছে। বন্দরের কার্যক্রম সচল থাকলেও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন—বন্দর ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।
বিলোনিয়া স্থলবন্দর সূত্র জানায়, ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়া সীমান্তে অবস্থিত এই স্থলবন্দর দেশের পাশে এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুহুরীঘাট এলসিএস স্টেশন হিসেবে পরিচিত। ২০০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিলোনিয়া শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৯ সাল থেকে আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক থাকলেও ২০১৯ সালে বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সীমারেখার কারণে বিএসএফ কাজ বন্ধ করে দেয়। প্রায় ছয় বছর পার হলেও সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি।
স্থলবন্দর চালুর ফলে ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বেড়ে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশাবাদী ছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, এতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতিও কিছুটা হলেও কমবে। তবে দীর্ঘ ১৬ বছর পার হলেও এ লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল বাণিজ্যের অংশ সিংহভাগ, কারণ দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘ সীমান্ত। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি পর্যটন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার জন্য ভারতে যান। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হলেও এই স্থলবন্দর এখনও কার্যত নিষ্ক্রিয়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, স্থলবন্দরের মূল ফটকে সুনসান নীরবতা। ফটকের প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তা প্রহরীর সঙ্গে আলাপ করে ভেতরে প্রবেশ করলে প্রশাসনিক ভবনের পুরোটা ফাঁকা দেখা যায়। কথা হয় বন্দরের সহকারী পরিচালক হিসাবরক্ষক ও ওয়ারহাউজ সুপারের সঙ্গে। হিসাবরক্ষক মো. হানিফ বলেন, বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে কোনো পণ্য আমদানি হয় না বললেই চলে। শুধু রপ্তানিই হয়। রপ্তানি হয় সিমেন্ট, রশি ও পেরেক। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ গাড়ি পণ্য। আমদানি হয়েছে ৩৮ মেট্রিক টন পণ্যের মাত্র ২টি গাড়ি। বন্দরের ওয়ারহাউজ সুপার ইমাম হাসান বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এ বন্দর দিয়ে ২ গাড়িতে ৩৮ মেট্রিক টন মরিচ, আদা ও বেল আমদানি হয়েছিল। এছাড়া এ বন্দরে কোনো পণ্য তেমন আমদানি হয় না।
উত্তরণ ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার ইসমাঈল হোসেন বলেন, এ বন্দর দিয়ে ভারত সরকার যেসব পণ্য আমদানির অনুমতি দিয়েছে তা খুবই স্বল্প। এ বন্দর দিয়ে গবাদিপশু, মাছের পোনা, তাজা ফলমূল, গাছ, বীজ, গম, পাথর, কয়লা, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, কাঠ, টিম্বার, চুনাপাথর, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, বলক্লে ও কোয়ার্টজ আমদানির অনুমতি থাকলেও বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের পণ্য রপ্তানির অনুমতি রয়েছে।
বিলোনিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টার মিজানুর রহমান বলেন, এ অঞ্চলে মশলা, চাল, আগরবাতি, টমেটোর চাহিদা বেশি। কিন্তু এসআরওতে এগুলো আমদানির অনুমতি নেই। আবার গম, পেঁয়াজ, আদাসহ অন্য নিত্যপণ্য আমদানির অনুমতি থাকলেও সেগুলো আনতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এজন্য বিক্রয় মূল্যের চেয়ে ক্রয় ও পরিবহন মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয় না।
বিলোনিয়া স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. হান্নান মিয়া বলেন, বিলোনিয়া বন্দরে যাত্রী আগমন ও বহির্গমন কমেছে। তবে রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৮৬ হাজার ৪৮২ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে, রাজস্ব আদায় হয়েছে ১১ লাখ ৪০ হাজার ৮৯ টাকা।
বিলোনিয়া স্থল বন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ মনির হোসেন মজুমদার বলেন, সরকার পরিবর্তনের ফলে পণ্য রপ্তানিতে এ শুল্ক স্টেশনে কোনো সমস্যা হয়নি। শুধু ভারতীয় ভিসা জটিলতায় যাত্রী পারাপার কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন ২ হাজার ৯৫৬ জন, ভারত থেকে এসেছিলেন ৩ হাজার ২৩৮ জন। ভিসা জটিলতার কারণে প্রতিনিয়ত যাত্রী পারাপার কমছে।
ফেনীর অন্যতম আঞ্চলিক মহাসড়ক হলো ফেনী-বিলোনিয়া সড়ক, যা বিলোনিয়া স্থলবন্দরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করা হচ্ছে, যা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্যকে আরও বৃদ্ধি করবে। বর্তমানে সড়কটির প্রস্থ ৫.৫০ মিটার (১৮ ফুট) হলেও উভয় পাশে ৪.৮০ মিটার করে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, ফলে মোট প্রস্থ হবে ১০.৩০ মিটার (প্রায় ৩৪ ফুট)। প্রকল্পটি তিনটি লটে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি লটের কাজ পেয়েছে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং একটি লটের কাজ পেয়েছে মাইশা কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড।
