ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে ব্যবহৃত জাপানি গাড়ির ব্যবসায়ীরা নতুন সংকটে পড়েছেন। জাহাজ থেকে গাড়ি খালাস করতে না পারায় ব্যবসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাপানে দুই দশক ধরে বসবাসকারী হায়দার আলীর প্রতিষ্ঠান কোবে মোটর জাপান থেকে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় ব্যবহৃত গাড়ি রপ্তানি করে আসছে। উন্নত মান ও বাধ্যতামূলক রক্ষণাবেক্ষণের কারণে জাপানি গাড়ি দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ হওয়ায় এসবের চাহিদা বেশি। তবে চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় এই খাতের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই হায়দার আলী জানতে পারেন, তাঁর ৫০০টির বেশি গাড়ির চালান সমুদ্রে আটকা পড়ে আছে। জাহাজটি শ্রীলঙ্কার বন্দরে প্রবেশ করতে পারছিল না। জানানো হয়, দুবাই থেকে আসা কার্গোর চাপের কারণে বন্দরে জায়গা খালি নেই। তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কায় পাঠানো গাড়িগুলো দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অপেক্ষায় ছিল। পরে গত সপ্তাহে সেগুলো হম্বানটোটা বন্দরে খালাস করা হলেও এতে ১০ দিনের বেশি বিলম্ব হয়েছে।
হায়দার আলীর সমস্যা থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং হরমুজ প্রণালির আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবহৃত গাড়ি ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী এই শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যবসা এমনিতে ছোট। তবে এর সরবরাহব্যবস্থা থেকে সবকিছু একত্র করলে দেখা যায়, এই ব্যবসার পরিসর যথেষ্ট বড়। হায়দার আলী জানান, বন্দরের জটের কারণে কিছু জাপানি জাহাজ কোম্পানির মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কোম্পানি চালান বাতিল করেছে, কিছু আবার পাকিস্তান বা চীনের বন্দরে কার্গো পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানি গাড়িপ্রতি ৫ হাজার ডলার আমানত চেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁর কিছু গাড়ি জাপানে ফেরত আসতে পারে।
কোবে মোটর বছরে প্রায় ১৮ হাজার গাড়ি রপ্তানি করে, প্রধানত শ্রীলঙ্কার বাজারে। বর্তমানে হায়দারের প্রায় ৫০টি ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ি—রোলস-রয়েস, ল্যাম্বারগিনি ও ফেরারি—শ্রীলঙ্কা ও চীনের বন্দরে রাখা রয়েছে। এসব গাড়িবাহী জাহাজগুলো দুবাই পৌঁছাতে পারছে না। হায়দার আলী বলেন, বিমানে চালান পাঠানো যেতে পারে, কিন্তু এতে খরচ অনেক বেশি পড়বে। তখন কেবল ধনীরাই এসব গাড়ি কিনতে পারবেন। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্মিলিতভাবে গত বছর ১৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের ব্যবহৃত গাড়ি রপ্তানি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। জাপানি গাড়ির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, সেখানে ২ লাখ ২৪ হাজার ইউনিট গাড়ি পাঠানো হয়েছে, মোট রপ্তানির প্রায় ১৫ শতাংশ।
চলতি মৌসুমে দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যবহৃত গাড়ির চালান বন্ধ হয়ে গেছে। মার্চ-সেপ্টেম্বর সময়ে সাধারণত মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য স্থানে ভ্রমণ ও নির্মাণ কার্যক্রম বৃদ্ধির কারণে চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইঞ্চিয়ন বন্দরের একটি গাড়ি সংরক্ষণ কমপ্লেক্সের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শিপিং কোম্পানির কর্মকর্তা কাং তে-ইয়াং জানান, প্রায় ৮০ শতাংশ গাড়ি সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যে যায়। তাঁদের গাড়ির ৭০ শতাংশের বেশি বর্তমানে গুদামে আটকে আছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই সমুদ্রে ভাসমান কিছু জাহাজ ভ্রমণ স্থগিত বা বিকল্প পথ অনুসরণ করছে। সংরক্ষণ স্থানে থাকা গাড়ি পরিবহন বিঘ্নের কারণে সরানো যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে জাহাজে লোড হওয়া গাড়ি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়নি।
কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি এড়াতে বিকল্প হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য বা আরও দূরের বন্দরে কার্গো নামানোর পরিকল্পনা করছে। পরিবেশকেরা বলছেন, এটা মূলত শিপিং লাইনের সিদ্ধান্ত। পরিবেশকেরা বিকল্প ব্যবস্থা বোঝার জন্য আলোচনা করছেন।
ব্যবহৃত গাড়ির পরিবেশক অটোমোবাইল ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট জিন জে-ওং বলেন, ‘যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আমাদের হাতে শুধু দুটি উপায় থাকে—অপেক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ।’ জিন বলেন, যখন সাধারণত গাড়ির দাম বাড়তে শুরু করে, তখনই সংঘাত শুরু হয়। তার কোম্পানি ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্রয় করা গাড়ি সংরক্ষণের জন্য মাসে প্রায় ৪ কোটি ওন খরচ করছে। তিনি বলছেন, প্রয়োজনমতো গাড়ি আগাম কিনে রাখার পরিকল্পনা করছেন এখন, আশা করছেন, সংঘাত শেষ হলে চাহিদা আবার বাড়বে।
কিছু রপ্তানিকারক বিকল্প বাজার খুঁজছেন। কিন্তু আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা নেই। ভেন্টাস অটোর প্রেসিডেন্ট ইউন সেং-হিউন বলেন, সমুদ্রে ভাসমান কার্গোর শেষ গন্তব্য কোথায়, তা না জানার কারণে এখন কার্যত হাতে সমাধান নেই।
