যুদ্ধপরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি ১২% ছাড়াবে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ আরও তীব্র হতে পারে। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং জ্বালানি তেলের দামও বাড়তে পারে। এই দুই প্রভাব মিলিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার বর্তমান ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থা থেকে বেড়ে ১২ শতাংশের বেশি হতে পারে। পাশাপাশি, বাড়তি আমদানি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বর্তমান ভিত্তি অনুযায়ী ৩১ দশমিক ১২ বিলিয়ন থেকে ২৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন (১০০ কোটিতে এক বিলিয়ন) বা ২ হাজার ৪২৪ কোটি ডলারের ঘরে নেমে আসতে পারে। যার প্রভাব অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও পড়বে। তবে জ্বালানি তেলের দাম বেশি না বাড়ালে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে আমদানিতে চাপ কম পড়বে, টাকার অবমূল্যায়নও কম হবে। ফলে মূল্যস্ফীতিতে চাপ তুলনামূলকভাবে কমে আসবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিরূপণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদ্ধতি ও মডেল ব্যবহার করে একটি পূর্বাভাস তৈরি করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয়, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাড়তি ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেখানে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৭০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ৩০ শতাংশ বাড়লে, দেশের বাজারেও সরকারকে তেলের দাম সমন্বয় করতে হতে পারে। একই সময়ে প্রথম প্রান্তিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ৫ শতাংশ কমে গেলে, ডিসেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের সম্মিলিত প্রভাব পড়বে। এতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যেখানে ভিত্তি ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই বিশ্লেষণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ভিত্তি ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৭২ কোটি ডলার। তবে উল্লিখিত হারে টাকার অবমূল্যায়ন এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে রিজার্ভ কমে ২ হাজার ৬০৬ কোটি ডলারে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্য একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মান যদি ৫ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১০ শতাংশ অবমূল্যায়িত এবং জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতিতে সমন্বিত ধাক্কা লেগে ১২ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে এ পদ্ধতিতে রিজার্ভ কমে ২ হাজার ৪২৪ কোটি ডলারে নেমে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পুরো হিসাবটিই বিভিন্ন ধারণার ওপর অনুমাননির্ভর জ্বালানি তেল ও ডলারের দাম ধরে নিরূপণ করা হয়েছে। এছাড়া যদি বৈশ্বিক বাজারে তেলের দামের আকস্মিক বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। ফলে রিজার্ভে চাপ পড়বে। কিন্তু সরকার যদি অভ্যন্তরীণভাবে বাড়তি রাজস্ব আহরণ করে এবং দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি না করে বা অপরিবর্তিত রাখে, তবে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে হঠাৎ কোনো বড় পরিবর্তন বা দাম বেড়ে যায় এবং এ কারণে ডলারের ওপর চাপ বেড়ে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে, তবে তা দেশের অর্থনীতির দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে টাকার বিনিময় হারকে দুর্বল করে দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। তখন মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এতে রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার বিক্রি করতে হবে। ফলে রিজার্ভ কমে যাবে। এমন প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং বাড়তি ডলার সংগ্রহ করতে বিনিময় হারে কিছুটা নমনীয়তা আনতে হতে পারে বা ডলারের দাম কিছুটা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়, ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে সমন্বয় করতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সব পদ্ধতিতেই দেখা যায়, তেলের দাম বৃদ্ধি ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন অভ্যন্তরীণ পণ্যমূল্যের ওপর তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা প্রকারান্তরে মূল্যস্ফীতির চাপকেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়বে। যার সরাসরি প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়বে।