দেশে স্মার্টফোন বাজারে গত কয়েক মাস ধরে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পরিকল্পনার কারণে। মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্মার্টফোন আমদানিতে বড় অংশের শুল্ক কমিয়ে দেয়। সাধারণভাবে এ পদক্ষেপের ফলে দাম কমার কথা ছিল। এনবিআর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি ঘোষণা করলেও বাস্তবে দাম কমার পরিবর্তে উল্টো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। চার মাসের মধ্যে স্মার্টফোনের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীরা বলছেন, সরবরাহ সংকটে মেমরি চিপের দাম বাড়ায় স্মার্টফোনের মূল্যও বেড়েছে। তবে ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, চিপের দামের তুলনায় ফোনের দাম অনেক বেশি বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশে দাম বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও দেশে শুল্ক কমানোর পরও দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। গ্রাহক পর্যায়ে হ্যান্ডসেটের দাম কমানোর জন্য চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি স্মার্টফোন আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং স্থানীয় উৎপাদনে ৫ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়েছিল। এতে মোবাইল ফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। এনবিআর জানিয়েছিল, ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের ফোনের দাম আনুমানিক ১,৫০০ টাকা কমার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে দাম কমার বদলে ৭০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, মধ্যম বাজেটের জনপ্রিয় ফোনগুলোর দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, তাতে সাধারণ ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন। যেমন, ইনফিনিক্স স্মার্ট ১০ প্লাস (৪জিবি/১২৮জিবি) মডেলটির দাম ডিসেম্বর মাসে ছিল ১১ হাজার ৪৯৯ টাকা, যা সাড়ে ৩ হাজার টাকা বেড়ে মার্চে ১৪ হাজার ৯৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে শাওমি রেডমি নোট ১৪ (৮জিবি/২৫৬জিবি) মডেলের দাম তিন হাজার টাকা বেড়ে এখন ২৮ হাজার ৯৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টেকনো স্পার্ক ৪০ প্রোর (৮জিবি/১২৮জিবি) দাম ৩ হাজার টাকা বেড়ে ২২ হাজার ৯৯৯ টাকা হয়েছে। ভিভো ওয়াই১৯এস প্রোর (৬জিবি/১২৮জিবি) দাম বেড়েছে ২ হাজার টাকা। এটি বর্তমানে ১৮ হাজার ৯৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রিয়েলমি নোট ৭০ (৪জিবি/১২৮জিবি) মডেলের দাম ২ হাজার টাকা বেড়ে ১৪ হাজার ৯৯৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অপেক্ষাকৃত দামি ফোনের মধ্যে স্যামসাং এ১৭ (৮জিবি/২৫৬জিবি) মডেলটির দাম ৭০০ টাকা বেড়ে এখন ৩৩ হাজার ৬৯৯ টাকা হয়েছে। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অপ্পো ও রিয়েলমি তাদের বিভিন্ন হ্যান্ডসেটের দাম মার্চ মাসেই দুই দফায় বাড়িয়েছে। তবে ব্যতিক্রম দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটন, কোম্পানিটির স্মার্টফোনের দাম স্থিতিশীল রেখে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
তবে শুল্ক কমার প্রভাব স্মার্টফোন নির্মাণ শিল্পের ওপর ১ শতাংশের কম বলে দাবি করেছেন চীনা ব্র্যান্ড শাওমির বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সদস্য জিয়াউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘৫ শতাংশ শুল্ক কমানো হলেও যারা বড় আকারে উৎপাদন করেন, তাদের গড় ট্যাক্স প্রায় ৬০ শতাংশ। নতুন এই শুল্ক ছাড়ের প্রকৃত প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে মাত্র ১ শতাংশের মতো।’ তাছাড়া মেমরি চিপের সংকটের কারণে দাম বাড়াতে হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আগে যে মেমরি চিপ আমরা ৪০ ডলারে কিনতাম, এখন তা ১০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। শুধু মোবাইল নয়, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের দামও বিশ্বজুড়ে বেড়েছে।’
দক্ষিণ কোরীয় ব্র্যান্ড স্যামসাংয়ের বাংলাদেশে পরিবেশক ও উৎপাদন অংশীদার এক্সেল টেলিকমের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন টিপুও একই সুর জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ২৬০টি যন্ত্রাংশের ওপর ভিন্ন ভিন্ন শুল্ক থাকায় সামগ্রিক প্রভাব মাত্র ০.৭৬ থেকে ১ শতাংশের মতো হয়েছে। সাইফুদ্দিন টিপু আশঙ্কা করেছেন, এআই ডেটা সেন্টারগুলোর চিপ চাহিদা বাড়ার কারণে ২০২৬ জুড়েই ফোনের বাজারে অস্থিরতা থাকতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের দ্রুত বিস্তার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারে বড় বিনিয়োগের ফলে মেমরি চিপের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে বাজারে এর প্রভাব পড়েছে; ওয়ার্ল্ড সেমিকন্ডাক্টর ট্রেড স্ট্যাটিসটিকসের (ডব্লিউএসটিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চিপের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে চলতি বছরে গড়ে স্মার্টফোনের দাম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি) জানিয়েছে।
মেমোরি চিপ সংকটের অজুহাতে স্মার্টফোনের দাম অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ গ্রাহক অধিকার কর্মীদের। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের দাম কিছুটা বেড়েছে— এটি সত্য। কিন্তু তার প্রভাবে একটি হ্যান্ডসেটের দাম যতটা বাড়ার কথা, বাংলাদেশে বাড়ানো হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিস্ময়কর বিষয় হলো, চিপ সংকটের কারণে ভারত বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মোবাইলের দাম এতটা বাড়েনি।’ চিপের দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে যতটা দাম বাড়ানো হয়েছে, প্রতিবেশী দেশে বেড়েছে তার চেয়ে অনেক কম। ভারতে স্মার্টফোনের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু ভারতের ব্যবসায়ীরা কোনো শুল্কছাড় পায়নি। অথচ শুল্ক কমানোর পরও বাংলাদেশে স্মার্টফোনে দাম ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মহিউদ্দিন আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুল্ক কমানোর পরও দাম না কমিয়ে উল্টো বাড়ানো হয়েছে। কখনও আন্দোলনের অজুহাত, কখনও বৈশ্বিক অস্থিরতার কথা বলা হচ্ছে। অথচ তারা অস্থিরতার আগেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।’
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) বা সরকারের কোনো তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা বিটিআরসিকে বলেছিলাম, মোবাইলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হোক। কিন্তু বিটিআরসি এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে রাষ্ট্র শুল্ক ছাড় দিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর গ্রাহক বাড়তি দামে ফোন কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। লাভবান হচ্ছে কেবল মুষ্টিমেয় কিছু বড় প্রতিষ্ঠান।’ এ বিষয়ে বিটিআরসির কমিশনার (স্পেকট্রাম) মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য দিতে রাজি হননি। বিটিআরসির এই কমিশনার বলেন, ‘বিটিআরসির পক্ষ থেকে কমেন্ট করার ব্যাপারে আমার অনুমতি নেই।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের একজন উপসচিব জানান, স্মার্টফোনের বাজার নজরদারি তাদের অধীনে নয়।
