মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আদায়ের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব ব্যক্তিগত ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সাধারণ মানুষের যানবাহনে কোনো ধরনের কর আরোপ করা হবে না। এতে নিম্নআয়ের মানুষের করের চাপ কমবে বলে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে গত ১২ মে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ‘বাইকের চাকা ঘুরলেই কর’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই মোটরসাইকেল চালকরা এনবিআরের ঘেরাও, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালন করেন।
তাঁরা বলেন, ‘বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন শুধু শখের বাহন নয়। দৈনন্দিন যাতায়াত ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রাইড শেয়ার চালকরা সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অনেক নারীও ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহার করে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে চলাচল করছেন। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা এরই মধ্যে নিবন্ধন ফি, রোড ট্যাক্স, ফিটনেস, বীমা ও জ্বালানির ওপর বিদ্যমান কর পরিশোধ করছেন। এর সঙ্গে নতুন করে অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা থেকে অগ্রিম আয়কর বাবদ সরকারের প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা ছিল। বিষয়টি নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রস্তাবে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছিলেন। তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রথমে কর হার কমিয়ে অর্ধেক এবং পরে সম্পূর্ণভাবে তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে, ১৫০ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের মালিকদের বাধ্যতামূলকভাবে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) গ্রহণ করতে হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপ, বাস, ট্রাক ও পিকআপের মতো যানবাহনের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর নেওয়া হয়। মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আগে কখনো অগ্রিম আয়কর ছিল না। তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিসিভেদে মোটরসাইকেলে বছরে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা এবং এলাকাভেদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল।
সূত্র জানায়, ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলে বছরে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে এই করের হার কমিয়ে এক হাজার, তিন হাজার ও পাঁচ হাজার নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এককালীন নিবন্ধন ফি এবং দুই বছর পর পর রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ৫০ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ৯ হাজার ২৯১ টাকা। এরপর প্রতি দুই বছর পর পর এক হাজার ১৫০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়। ১২৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি ১১ হাজার ৭৬৪ টাকা এবং প্রতি দুই বছর পর পর দুই হাজার ৩০০ টাকা রোড ট্যাক্স দিতে হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০। সংস্থাটির কাছে সিসিভিত্তিক আলাদা পরিসংখ্যান না থাকলেও ১১০ সিসি বা এর নিচের মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১০ লাখ ধরে হিসাব করলে করযোগ্য মোটরসাইকেল দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ লাখ। গড়ে প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে চার হাজার টাকা করে কর আদায় করা হলে সরকারের রাজস্বে বছরে প্রায় এক হাজার ৫২০ কোটি টাকা যুক্ত হতে পারত। অন্যদিকে, বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অগ্রিম আয়কর ২ হাজার ৫০০ টাকা, আর সিসিভেদে প্রাইভেট কার ও জিপে এই কর ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত আছে। এছাড়া দোতলা বাস, এসি মিনিবাস ও কোস্টারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা, ৫২ আসনের বেশি বাসে ২৫ হাজার টাকা এবং এর কম আসনের বাসে ২০ হাজার টাকা কর প্রযোজ্য, আর এসি বাসে ৫০ হাজার টাকা এবং নন-এসি মিনিবাস বা কোস্টারের ক্ষেত্রে ১২ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত রয়েছে।
এ ছাড়া পাঁচ টনের বেশি ধারণক্ষমতার ট্রাক, লরি ও ট্যাংকলরির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ৩০ হাজার টাকা, দেড় থেকে পাঁচ টন ওজনের যানবাহনে ১৫ হাজার টাকা এবং দেড় টনের কম ওজনের যানবাহনে সাড়ে সাত হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার ও থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রেও একই হারে সাড়ে সাত হাজার টাকা কর দিতে হয়, যা বিআরটিএ ফিটনেস নবায়নের সময় আদায় করা হয়। এদিকে, বাংলাদেশে গত এক দশকে মোটরসাইকেল শিল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ ও টিভিএসের বিভিন্ন মডেল এখন দেশে সংযোজন করা হচ্ছে, ফলে এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে মোটরসাইকেলের বিক্রি ও উৎপাদন কমে যেতে পারে, যার ফলে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার করও বাতিল
মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার ক্ষেত্রে বছরে পাঁচ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় দুই হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে এক হাজার টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে এই করও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা নেই। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, দেশে অন্তত ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই চলছে ১২ থেকে ১৫ লাখ।
