‘মিনিকেট’ নামে চালের বাজারে বড় প্রতারণা

দেশে ‘মিনিকেট’ নামে ধানের কোনো স্বীকৃত জাত নেই, এমনকি এর বিক্রি বন্ধে আইনও রয়েছে; তবুও বছরের পর বছর বাজারে দাপটের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে এই চাল। মূলত স্বর্ণা, পাইজাম, বিআর-২৮সহ বিভিন্ন মোটা ও মাঝারি জাতের ধান কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কিনে মিলাররা মজুত করেন। পরে আধুনিক যন্ত্রে অতিরিক্ত ছাঁটাই ও পলিশ করে এগুলোকে সরু ও চকচকে চাল হিসেবে প্রস্তুত করা হয়, যা এজেন্ট, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে ‘মিনিকেট’ নামে উচ্চ দামে বিক্রি হয়। এ প্রক্রিয়ায় বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছে একটি চক্র। তবে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, অতিরিক্ত পলিশের কারণে চালের ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবার নষ্ট হয়ে স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের চাল বেশি খেলে শরীরে দ্রুত শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানায়, দেশে ‘মিনিকেট’ চালের কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই, কারণ এটি কোনো স্বীকৃত ধানের জাত নয়। তবে চালকল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চালের চাহিদার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই ‘মিনিকেট’ নামে বিক্রি হয়, যা বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টনের সমান। খুচরা বাজারে যেখানে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৬০ টাকা, সেখানে ‘মিনিকেট’ বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকায়; অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ২৫ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে। এ হিসাবে বছরে ৪ হাজার ৫০০ কোটিরও বেশি টাকা মুনাফা করছে একটি চক্র, যারা পাইকার, এজেন্ট ও খুচরা বিক্রেতাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার পকেট থেকে এই অর্থ তুলে নিচ্ছে।

ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘মিনিকেট’ নামে প্রতারণা বন্ধে ২০২৩ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় আইন প্রণয়ন করলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নেই; ফলে প্রকাশ্যেই এই নামে চাল বিক্রি হচ্ছে এবং মিলার-ব্যবসায়ী চক্রের প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রেতা ও কৃষক। তাঁর মতে, এভাবে প্রতি বছর ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা রোধে দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যদিকে উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)-এর কনসালট্যান্ট ডা. এম এ সোবাহান বলেন, অতিরিক্ত পলিশের কারণে চালের ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘মিনিকেট’ চাল বেশি খেলে শরীরে দ্রুত শর্করার মাত্রা বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, চালের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পুষ্টিমান নিশ্চিত করা জরুরি, যা কৃষকের উৎপাদিত মোটা ও মাঝারি চালেই বিদ্যমান।

দিনাজপুরের কৃষক মো. করিম বলেন, মাঠে ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধান চাষ করা হয় না এবং কৃষি কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কখনো কোনো তথ্য দেননি—তাহলে এই চাল আসে কোথা থেকে, এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম জানান, বাংলাদেশে ‘মিনিকেট’ নামে ধানের কোনো স্বীকৃত জাত নেই; বাজারে যে চাল ‘মিনিকেট’ নামে বিক্রি হচ্ছে, তা আসলে বিভিন্ন জাতের ধান প্রক্রিয়াজাত করে ভিন্ন নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। একই কথা বলেন বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ মোহাম্মদ মাসুম। তাঁর মতে, সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই ‘মিনিকেট’ নামে ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়নি, এমনকি বিদেশ থেকেও এই নামে কোনো ধান আমদানি করা হয়নি; বাজারে যে চাল পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত মিল মালিকদের প্রতারণার ফল।

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাজারে দাপট

মিনিকেট নামে চাল বিক্রির প্রতারণা ঠেকাতে ২০২৩ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন সরকার একটি আইন প্রণয়ন করে। ওই আইনে চালের বস্তায় ‘মিনিকেট’ বা অন্য কোনো বিভ্রান্তিকর নাম ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়। তবে আইন প্রণয়নের প্রায় তিন বছর পার হলেও বাজারে মিনিকেট চালের রমরমা ব্যবসা থামেনি। শুক্রবার রাজধানীর পাইকারি আড়ত বাদামতলী ও কাওরান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও শেরপুরের বিভিন্ন কোম্পানির নামে মিনিকেট চাল অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এসব চাল পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৩ সালে আইন হওয়ার পর বাজারে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। তখন বাজারে মিলাররা নাম পরিবর্তন করে বিক্রিও শুরু করেছিল। তবে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে গিয়ে এক্ষেত্রে তদারকি কিছুটা কমেছে। যে কারণে বাজারে মিনিকেট নামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে অভিযান থেমে নেই। সামনে আবারও কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।

মাঠ থেকে মিল পর্যায়ে বদলে যায় চালের পরিচয়

অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃষকের মাঠে উৎপাদিত মোটা ও মাঝারি দানার চাল বিভিন্ন মিলে একাধিক ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রে ঘষে চালকে ছোট ও মসৃণ করা হয়, এরপরই সেটিকে ‘মিনিকেট’ নামে বাজারজাত করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, ভোক্তাদের পছন্দের কারণেই তারা এই নামে চাল বিক্রি করছেন। কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি আড়তদার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ভোক্তার চাহিদাকে কেন্দ্র করেই একটি কৃত্রিম বাজার তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষ সব সময় নতুন কিছু খেতে চায়। আগে গ্রাম থেকে শহরে মোটা ও মাঝারি দানার চালের চাহিদাই বেশি ছিল, আর সরু চালের মধ্যে নাজিরশাইল তেমন জনপ্রিয় ছিল না এবং দামও ছিল তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শহরের মানুষ সরু চালের দিকে ঝুঁকেছে, ফলে এর চাহিদা বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই মিলাররা ‘মিনিকেট’ নামে চাল বাজারে ছাড়ছেন।