মশা নিধনে ১৪ বছরে ১৮ কোটি টাকার রাসায়নিক প্রয়োগ

চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন

মশা নিধন কার্যক্রম পরিদর্শনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র সফর আটকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মন্তব্য করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে ‘মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য আমেরিকা না গিয়ে দেশের কোনো ডোবার পাশে বসলেই উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব’। এদিকে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রথমে দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সফর বিষয়ে সম্পূর্ণ ভুল, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মূলত কারখানা ও ল্যাব পরিদর্শনের উদ্দেশ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার জন্য সরকারি অনুমোদন চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি এ অবস্থান থেকে সরে আসেন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দিনভর আলোচনা-সমালোচনা চললেও প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য দেশজুড়ে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মশক নিধনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় ‘দেশি ভেষজ প্রযুক্তি শতভাগ কার্যকর’ বলে মত এলেও রাসায়নিক প্রয়োগেই বেশি আগ্রহী চট্টগ্রাম সিটি। অথচ চসিকের গবেষণায়ও এসব রাসায়নিক কম কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও গত ১৪ বছরে ১৮ কোটি টাকার কম কার্যকর রাসায়নিক প্রয়োগ করেছে সংস্থাটি। যদিও মশক নিধনে এসবের কার্যকারিতা মাত্র ১৬-২৫ শতাংশ। সর্বশেষ মার্কিন কোম্পানি ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসি থেকে মশা নিধনে প্রায় পৌনে চার কোটি টাকার আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস কিনেছে চসিক। বর্তমানে এই ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে।

মশা নিধন কার্যক্রম পরিদর্শনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র সফর আটকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মন্তব্য করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে ‘মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য আমেরিকা না গিয়ে দেশের কোনো ডোবার পাশে বসলেই উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব’। এদিকে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রথমে দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সফর বিষয়ে সম্পূর্ণ ভুল, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মূলত কারখানা ও ল্যাব পরিদর্শনের উদ্দেশ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার জন্য সরকারি অনুমোদন চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি এ অবস্থান থেকে সরে আসেন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দিনভর আলোচনা-সমালোচনা চললেও প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য দেশজুড়ে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মেয়রের বিবৃতি

গতকাল বিকেলে ডা. শাহাদাত হোসেনের ফেসবুক পেজে ‘ভুল তথ্য আর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে মশক নিধনের বৈপ্লবিক সম্ভাবনা কি ভেস্তে যাবে ?’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে তাঁর বরাতে উল্লেখ করা হয়, স্বার্থান্বেষী মহল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সফরের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভুল, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে। তবে গতকাল রাতে এক বিবৃতিতে মেয়র উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর প্রসঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সফর বিষয়ে তিনি কোনো গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য দেননি। সফরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং জনসম্পৃক্ততাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। রাষ্ট্রনায়ক জনাব তারেক রহমান একটি সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আর কোনো ওষুধ কোম্পানি যদি কারও ভ্রমণের ব্যবস্থা করে তাহলে সেখানে তাদের একটা আগ্রহ থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, মশক নিধনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী গবেষণা দরকার। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ব বিভাগ নেই। তাদের উচিত কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করা। বারবার বিদেশে গিয়ে তো আর মশা নিধন শেখা সম্ভব না।

শতভাগ কার্যকর ঔষধি গাছের নির্যাস

২০২১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষক মশা নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়োগকৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে একটি গবেষণা চালায়। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চবি উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক। ওই সময় চসিক পূর্ণাঙ্গ মশক নিধনে ফগার মেশিন দিয়ে লিকুইড এডালটিসাইড (ল্যামডা-সাইহ্যালোথ্রিন ও ডেল্টামোথ্রিনের মিঙার) কীটনাশক এবং মশার লার্ভা নিধনে স্প্রে করে ‘এম ফস ২০ ইসি (ক্লোরপাইরিফস)’ নামের লার্ভিসাইড ব্যবহার করত।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আমরা চার বছর আগে ২৫০টি ঔষধি উদ্ভিদের নির্যাস নিয়ে গবেষণা করেছি। ১৫ ধরনের উদ্ভিদের নির্যাস পেয়েছি, যেগুলো ব্যবহারে পাঁচ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে লার্ভা মারা যাচ্ছে। গবেষক শ্যামল চৌধুরী বলেন, আমার উদ্ভাবিত মসকুবার ভেষজ ওষুধ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে মশক নিধনে শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সাবেক মেয়র রেজাউল করিমের আমলে পরীক্ষামূলকভাবে ১০০ লিটার ওষুধ কেনা হলেও পরে চসিক আর আগ্রহ দেখায়নি।