** ফাস্টফুড, অন্যান্য খাবার ও পানীয় (মদ) বিক্রিতে ভ্যাট ফাঁকি প্রায় ২০ কোটি ১৭ লাখ টাকা
** মদজাতীয় পানীয় বিক্রিতে সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করা হয়নি প্রায় ৭০ লাখ ৭০ হাজার টাকা
** বিধি বহির্ভূত বা অবৈধভাবে রেয়াত নেওয়া হয়েছে প্রায় ৯৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা
ফাস্টফুড ও মদসহ খাদ্য ও পানীয় বিক্রিতে ভোক্তাদের কাছ থেকে নিয়মমাফিক ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক কেটে নিয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঢাকা। কিন্তু সেই ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়নি। এক-দুই বছর নয়, টানা পাঁচ বছর শুল্ক-কর পরিশোধ করেনি। এভাবে অন্তত ২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে দেশের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেলটি। এখানেই শেষ নয়, মদজাতীয় পানীয় বিক্রি থেকে ভ্যাটের পাশাপাশি প্রায় ৭০ লাখ টাকার সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করা হয়নি। প্রায় কোটি টাকার বিধিবহির্ভূত বা অবৈধ রেয়াত নিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিরীক্ষায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হোটেলের রাজস্ব ফাঁকির এই চিত্র উঠে এসেছে। ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পরিশোধে ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাছে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। তবে প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পরিশোধে গড়িমসি করছে। আইনানুগভাবে শুল্ক-কর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বলে দাবি করছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল।
এনবিআর সূত্রমতে, ফাস্টফুড, বিভিন্ন প্রকার খাবার, মদজাতীয় পানীয় বিক্রি থেকে নেওয়া ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকির এবং অবৈধভাবে রেয়াত নেওয়ার অভিযোগ পেয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঢাকার হিসাব নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয় এলটিইউ। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরের নিরীক্ষা শেষে হোটেলটির ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি ও অবৈধ রেয়াত নেওয়ার প্রমাণ মিলে। গত বছরের ৩ আগস্ট কমিটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ফাস্টফুড, বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয় বিক্রিতে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭৬১ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি করা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি এই এক বছরে প্রায় ১৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকার খাদ্য ও পানীয় বিক্রি করেছে, যার ওপর প্রযোজ্য ২ কোটি ৯৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭৬১ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া বিলাসবহুল এই হোটেল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে ফাস্টফুড, খাবার ও পানীয় (মদসহ) বিক্রিতে ১৭ কোটি ১৮ লাখ ৫৯৩ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এসব খাবার ও পানীয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি এই চার বছরে প্রায় ১১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার খাবার ও পানীয় বিক্রি করেছে, যার ওপর ১৭ কোটি ১৮ লাখ ৫৯৩ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে।
বিলাসবহুল হোটেলটিতে মদ ও মদজাতীয় পানীয় বিক্রি করা হয়। ভ্যাট বা মূসক আইন অনুযায়ী, মদ ও মদজাতীয় পানীয় বিক্রিতে ভ্যাটের পাশাপাশি সম্পূরক শুল্ক (এসডি) প্রযোজ্য। কিন্তু হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মদ ও মদজাতীয় পানীয় বিক্রিতে ৫৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৩ টাকা এবং ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ১২ লাখ ১১ হাজার ৯১২ টাকাসহ পাঁচ বছরে মোট ৭০ লাখ ৭০ হাজার ৬৯৫ টাকা সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করেনি।
ভ্যাট আইন অনুযায়ী, ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করলে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি কিছু খাতে রেয়াত নিতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটি যেসব খাতে রেয়াত নিয়েছে, তার প্রমাণ দেখাতে পারেনি। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিধি বহির্ভূতভাবে ৮৭ লাখ ৮ হাজার ৭১১ টাকা, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার ৪৮৫ টাকা এবং ৬ লাখ ৯ হাজার ২৬২ টাকাসহ মোট ৯৪ লাখ ২৮ হাজার ৪৫৮ টাকা অবৈধ রেয়াত নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোট ১৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বিক্রির ওপর মোট ২০ কোটি ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ৩৫৪ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া এই পাঁচ বছরে ৭০ লাখ ৭০ হাজার ৬৯৫ টাকা সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করেনি এবং ৯৪ লাখ ২৮ হাজার ৪৫৮ টাকা অবৈধ রেয়াত নিয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। তবে ফাঁকি প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিটি ফাঁকির ওপর সুদ প্রযোজ্য হবে। ফলে সুদসহ ফাঁকির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
এনবিআর সূত্রমতে, প্রতিবেদন দাখিলের পরপরই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক এবং অবৈধভাবে রেয়াত পরিশোধে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে এলটিইউ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো লিখিত জবাব না দিয়ে শুনানিতে অংশ নিতে তিনবার সময় বাড়ানোর আবেদন করে। পরে ৩০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপক আলী এমাম হোসেন, মো. জিয়াউল হক ও পরিচালক (অর্থ) মো. কামাল হোসেন শুনানিতে অংশ নেন। তারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ফাঁকি না দেওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। রাজস্ব পরিশোধ না হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে বোর্ড মিটিং না হওয়াকে দায়ী করে আরও একমাস সময় চান তিনি। একমাস সময় বাড়ানোর পরও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার ৫৪৯ টাকা অবৈধ রেয়াত ফেরত ছাড়া রাজস্ব পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রায় চার মাস সময়ক্ষেপণ করার পরও কোনো রাজস্ব পরিশোধ না করায় ডিসেম্বর মাসে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে এলটিইউ। ইতোমধ্যে এলটিইউর পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানকে ফাঁকি দেওয়া এই রাজস্ব পরিশোধে তাগাদা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে হোটেলের মালিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের সঙ্গে যোগাযোগ করলে লিখিত বক্তব্য দিতে প্রশ্ন চাওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের কর্মকর্তা (চিফ অব অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স) নিসার আহমেদ লিখিত বক্তব্যে জানান, ‘পারস্পারিক তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে রাজস্ব বিভাগ ও রাজস্ব পরিশোধে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্ভূত প্রশ্নবিদ্ধ দাবিনামার ওপর মতানৈক্য বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা বোধগম্য, রাজস্ব সংগ্রহ ও পরিশোধ কার্যক্রম সহজীকরণ এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিতকরণ আরও সহজতর হবে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা (বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের মালিকানাধীন) হিসেবে সেবা প্রদানের বিপরীতে প্রাপ্ত সেবামূল্যের ওপর বিধিবদ্ধ আইনি বিধানের অধীন যথাযথ ও প্রযোজ্য মূসক ও সম্পূরক শুল্ক প্রদান করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের একটি শাখা, বলাকা এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ, হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর এলাকার আওতাধীন ডিপার্চার টার্মিনালের ইমিগ্রেশন এরিয়া পরবর্তী ও বোর্ডিং ব্রিজ এরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এবং এই প্রতিষ্ঠানের ওই শাখা কর্তৃক ইমিগ্রেশনপ্রাপ্ত বিদেশে প্রস্থানে উদ্যত যাত্রীদের সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। এই সেবা প্রদানের স্থানটি আন্তর্জাতিক আইনমতে শুল্কমুক্ত হিসেবে স্বীকৃত।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও জানান, ‘মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ এর ধারা-৩(২)(ক) ও ধারা-৩(২)(খ) এর আওতায় বর্ণিত সেবামূল্য রপ্তানি হিসেবে এবং দি কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬৯ এর ধারা-২৪ এর আওতায় ওই সেবামূল্য শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত মর্মে গণ্য। এই বিষয়ে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (মূসক) কর্তৃপক্ষ ভিন্ন মত পোষণ করতঃ প্রশ্নবিদ্ধ আপত্তি উত্থাপন করেন, যার ফলশ্রুতিতে, বৃহৎ করদাতা ইউনিট (মূসক) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মূসক নিরীক্ষা কার্যক্রমের আওতায় জুলাই, ২০১৮ থেকে জুন, ২০১৯ সময়কালের জন্য সম্পূরক শুল্ক ও মূসকসহ মোট ৩ কোটি ১৭ লাখ ৬৮ হাজার ৯৫৯ টাকার এবং পরবর্তী জুলাই, ২০১৯ থেকে জুন, ২০২৩ সময়কালের জন্য সম্পূরক শুল্ক ও মূসকসহ মোট ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৮ টাকা ৭৯ পয়সার দাবিনামার উদ্ভব হয়েছে। বর্ণিত ক্ষেত্রে, উচ্চতর আদালতের আইনি বিশ্লেষণে আমরা বর্ণিত প্রশ্নবিদ্ধ দাবিনামা থেকে ন্যায়ানুগ প্রতিকারের মাধ্যমে অব্যাহতি পাওয়ার আশা ব্যক্ত করছি। বর্ণিত আপত্তির বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যার ভিন্ন মত থাকলেও করফাঁকি সম্পৃক্ত কোনো বিষয়ের অবকাশ নেই।’
এই বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছোট প্রতিষ্ঠান বা রেস্তোরাঁ ভ্যাট ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মতো বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলের ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি এবং অবৈধ রেয়াত নেওয়া কোনোভাবে সমীচীন হয়নি। ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক তো হোটেল নয়, ভোক্তা দেয়। ভোক্তার দেওয়া ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক এই হোটেল ফাঁকি দেবে কেন? এর আগেও এই হোটেল ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই হোটেলকে কমপ্লায়েন্সে আনতে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা উচিত।’
উল্লেখ্য, এর আগেও এই হোটেলের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের জুলাই থেকে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালের ১৮ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার ৯৯৪ টাকা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
