** ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোন মূসক দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি
** পণ্য বিক্রয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মূসক পরিশোধ করে না, মূসক দেয় না ক্রয়কৃত পণ্য মজুদে
** আড়ং গুলশান শাখার প্রায় ১৫ কোটি টাকার মূসক ফাঁকি। অন্য শাখার ফাঁকি খুঁজছে এনবিআর
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের আড়ং এর বিরুদ্ধে ভ্যাট বা মূসক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশের শীর্ষ ফ্যাশন শিল্প ব্র্যান্ড হিসেবে খ্যাতি পাওয়া আড়ং এর গুলশান পণ্য বিক্রয় ও পণ্য মজুদের বিপরীতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক নিরীক্ষায় এ ফাঁকি উঠে এসেছে। অপরিশোধিত ভ্যাট পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটির কাছে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি নিরীক্ষা শেষে এ দাবিনামা জারি করা হয়। তবে অন্য শাখা মূসক ফাঁকি দিচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে এনবিআর। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের হস্ত ও কারুশিল্প ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আড়ং এর গুলশান শাখার বিরুদ্ধে পণ্য বিক্রি ও ক্রয়কৃত পণ্য মজুদ করার আড়ালে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পায় এনবিআর। বিশেষ করে আড়ং গুলশান শাখা। শাখাটি এনবিআরের আওতাধীন কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) একটি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। সাপ্লাইয়ার ট্রেড হিসেবে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটি রেডিমেড গার্মেন্টস সেলস সেন্টার হিসেবে ভ্যাট প্রদান করে আসছে। এনবিআরের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটি নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট প্রদান প্রক্রিয়া ও দাখিলপত্র তলব করা হয়। বিশেষ করে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রফিট এন্ড লস একাউন্টস, কস্ট অব গুডস সোল্ড সেস্টমেন্ট, খতিয়ান, সেলস সেস্টমেন্ট এন্ড স্টক রির্পোট চাওয়া হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য প্রদান করে। নিরীক্ষায় একই সময়ে প্রাপ্ত তথ্য ও মাসিক দাখিলপত্র পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আড়ং গুলশান শাখা ২০১৫ সালের জুলাই হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৮ মাসে প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকার পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান করেছে। এ সেবার ওপর প্রায় ৭৭ লাখ ৮ হাজার টাকা উৎসে মূসক প্রযোজ্য। যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ অপরিশোধিত মূসকের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রায় ২১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। সুদসহ অপরিশোধিত মূসক প্রায় ৯৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। একই সাথে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার পণ্য বিক্রয় করেছে। যার ওপর প্রযোজ্য উৎসে মূসক প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ অপরিশোধিত মূসকের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রায় ২৩ লাখ টাকা। সুদসহ অপরিশোধিত মূসক প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ মাসে প্রায় ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা পণ্য বিক্রয় করেছে। যার ওপর প্রযোজ্য উৎসে মূসক ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এরমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও বাকি প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এ অপরিশোধিত মূসকের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রায় ৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সুদসহ মূসক ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান করেছে। যার ওপর প্রযোজ্য উৎসে মূসক প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠান তা পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এর ওপর ২ শতাংশ হারে মূসক প্রায় ৫০ লাখ ৮১ হাজার টাকা। ৪৮ মাসে প্রতিষ্ঠানটির সুদসহ মূসক ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
আড়ং গুলশান শাখা ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পণ্যের স্টক বা মজুদ রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কোটি ৫১ লাখ টাকার পণ্য ক্রয় করে স্টক বা মজুদ করেছে। যার ওপর যোগানদার হিসেবে ৪ শতাংশ হারে উৎসে মূসক প্রযোজ্য। ৪ শতাংশ হারে প্রযোজ্য মূসক প্রায় ২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। অপরিশোধিত মূসকের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সুদসহ উৎসে মূসকের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকার পণ্য ক্রয় করে মজুদ করেছে। যার ওপর যোগানদার হিসেবে ৫ শতাংশ হারে উৎসে মূসক প্রযোজ্য। ৫ শতাংশ হারে উৎসে মূসক প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অপরিশোধিত মূসকের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রায় ৮৬ লাখ টাকা। সুদসহ অপরিশোধিত মূসকের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা। যা পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ক্রয়কৃত পণ্য মজুদ করার মাধ্যমে মোট প্রায় ১০ কোটি সাড়ে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, আড়ং শুলশান শাখা ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট প্রায় ২৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকার পণ্য বিক্রয় বা সেবা প্রদান এবং অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৭৫ কোটি টাকার পণ্য মজুদ করেছে। পণ্য বিক্রয় ও মজুদ করা প্রায় ২০১ কোটি টাকার বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে মূসক প্রায় ১১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। সুদ প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির উৎসে মূসক ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। তবে আরো কোন কায়দায় প্রতিষ্ঠানটি মূসক ফাঁকি দিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
সুদ বাদে ফাঁকিকৃত মূসক পরিশোধে গত ৩১ মে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান সই করা দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। নোটিস জারির ১৫ দিনের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ ও কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বকেয়া পরিশোধ বা জবাব না দিলে মূসক আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে। আড়ং গুলশান শাখার বিরুদ্ধে এর আগে একই কায়দায় মূসক ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ভ্যাট দক্ষিণ কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে বলেন, আড়ং এর শুধু গুলশান শাখা নয় সব শাখার বিরুদ্ধে এনবিআরে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এনবিআরের নির্দেশে গুলশান শাখা নিরীক্ষা করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ ফাঁকি উৎঘাটন করা হয়েছে। দাবিনামা জারি করা হয়েছে। বকেয়া পরিশোধ না করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির আরো ফাঁকি উৎঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে আড়ং এর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজনেস বার্তাকে বলেন, আড়ং এর বিষয়টি দেখে তামারা হাসান আবেদ। তিনি দেশের বাইরে যাবেন। এ বিষয়ে কথা বলবেন না। ফাঁকির বিষয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই। যদি নোটিস জারি করা হয়েছে থাকে তাহলে আমরা আইন অনুযায়ী তা মোকাবেলা করবো। তবে ফাঁকির বিষয়ে আমরা কথা সাধারণত কোন স্টেটমেন্ট দেয় না।
