ভূমিকম্পের ৬০ কোটি টাকার উদ্ধার যন্ত্র তালাবদ্ধ

ভূমিকম্পে দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় কেনা ৬০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ রয়েছে। অধিকাংশ যন্ত্রপাতির মোড়কও খোলা হয়নি, ফলে ব্যবহার না হওয়ায় কার্যকারিতা কমছে। একই প্রকল্পের আওতায় ১২৫ কোটি টাকা খরচে নির্মিত ১০ তলা ভবনটিও তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, যেখানে ধুলোবালি জমেছে এবং আশপাশে আগাছা গজিয়েছে।

জানা যায়, ২০১৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৫৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সক্ষম করার উদ্দেশ্যে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্প শুরু করে। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ হেলালী। প্রকল্পের অধীনে কারিগরি ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন ৮২ জনকে পাঁচ দেশের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া চীনা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে মহাখালীতে রাজউকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের পাশে এক একর এলাকায় ১০ তলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়, যার প্রতি তলার আয়তন ১০ হাজার বর্গফুট। ভবনটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে সম্পন্ন হয়।

প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ভবনগুলোর ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই করার জন্য ২৫ ধরনের ১৫০টি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এসব যন্ত্রপাতি সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপান থেকে আমদানি করা হয় এবং কিছু ব্যবহার করে প্রকল্পের জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পুরো প্রকল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তুরস্ক ও ইরানের পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। এছাড়া প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য দুটি জিপ, ৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ, চারটি মাইক্রোবাস, ১০টি মোটরসাইকেল, কম্পিউটার, প্রিন্টার, এসি, চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হয়।

তখন বলা হয়েছিল, আরবান সেফটি অ্যান্ড রিজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট (ইউএসআরআই) নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হবে। প্রকল্পের আওতায় তৈরি ভবনটিই হবে ইউএসআরআইর প্রধান কার্যালয়। রাজউকের মাধ্যমে সরকার এই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেবে। প্রতিষ্ঠানটির কাজ হবে রাজধানী ঢাকা ও সিলেটের ভবনগুলোর ভূমিকম্প সক্ষমতার মান যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করে তালিকা দেওয়া, যাতে সরকার সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। পাশাপাশি দেশের অন্য ভবন মালিকরাও যেন এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ভবনের সক্ষমতা যাচাই করে নিতে পারেন। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে ইউএসআরআইর প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। আর যানবাহন, যন্ত্রপাতিগুলো ভেতরে রেখে দেওয়া হয়েছে। একদিনের জন্যও ওই ফটক খোলেনি। প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিরাও বেকার। আর গাড়িগুলো ব্যবহার করছেন রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি

প্রকল্পের আওতায় কেনা ১০টি স্ক্যানার মেশিনের মধ্যে মাত্র একটি খোলা হয়েছে, বাকি ৯টি এখনও বাক্সবন্দি। স্ক্যানারের মাধ্যমে ভবনের কলামের ভেতরে থাকা রডের মান এবং পরিমাণ শনাক্ত করা যায়। দুটি ক্যানেপেলিটেশন (CPT) টেস্টার মেশিন কেনা হয়েছে, যা ট্রাকের ওপর বসানো থাকে এবং মাটির গুণমান যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। ক্যাপাটেস্ট মেশিন কেনা হয়েছে ১০টি, যার মাধ্যমে কলামসহ যেকোনো কংক্রিটের মান পরীক্ষা করা সম্ভব। পাইল ইনটিগ্রিটি টেস্টার কেনা হয়েছে দুটি, যা ভবনের পাইলিংয়ের মান ও অবস্থা নির্ণয়ে ব্যবহার হয়। আলট্রা পালস ভেলোসিটি মেশিনও ১০টি কেনা হয়েছে, যা রঞ্জনরশ্মির মাধ্যমে ভবনের অন্যান্য অবকাঠামোর মান যাচাই করতে সক্ষম। এসব যন্ত্রপাতি ভবনের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য কেনা হলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে সবই তালাবদ্ধ রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক যন্ত্রপাতির সঙ্গে ব্যাটারি ও বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস যুক্ত আছে। এগুলো নিয়মিত চার্জ ও ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। সেটা না হলে এক সময়ে যন্ত্রটাই বিকল হয়ে যায়। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়। এর পর থেকে কার্যত সেগুলো পড়ে আছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত বছরের জুনে প্রকল্প পরিচালক আব্দুল লতিফ হেলালী সবকিছু রাজউককে বুঝিয়ে দিয়ে চাকরি থেকে অবসরে যান। এ ব্যাপারে আবদুল লতিফ হেলালী বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর থেকে ভবনটি তালাবদ্ধ। যন্ত্রপাতি সেখানে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এটা করা হয়েছিল, তা সফল হয়নি।

এ ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আরবান সেফটি অ্যান্ড রিজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট চালুর বিষয়ে আমরা ইতিবাচক। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছি। ট্রাস্টের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাষিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটিকে গড়ে তোলা হবে। এরই মধ্যে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ পুর্নগঠন করা হয়েছে। এমনকি রাজউক থেকে একটি তহবিলও তাদের দেওয়া হবে।