Header – Before
Header – After

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি-দুর্নীতি, তদন্তে দুদক

অতিরিক্ত কর কমিশনার মারুফ

** ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে মারুফ ও তার ভাই আরিফ চাকরি নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে
** ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করে ১২ কোটি টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন মারুফ
** দুর্নীতির ঘটনা সামনে আসায় মারুফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে এনবিআর
** মারুফ যেসব কাগজপত্র দিয়ে চাকরি নিয়েছেন এবং যেসব জায়গায় চাকরি করেছেন-এনবিআরের কাছে তার তথ্য চেয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে দুদক

দুই ভাই সরকারি চাকরি নিয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে। এর মধ্যে শাহ মোহাম্মদ মারুফ ২০১০ সালে আয়কর বিভাগে সহকারী কর কমিশনার হিসেবে যোগদান। মাত্র ১৫ বছর করছেন। এর মধ্যে প্রায় ১২ কোটি টাকায় বারিধারা কূটনৈতিক জোনে কিনেছেন ফ্ল্যাট। নিজ ও স্ত্রীর নামে রয়েছে বিলাসবহুল গাড়ি। নামে বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসায় ইতোমধ্যে অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) শাহ মোহাম্মদ মারুফকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। এবার আয়কর বিভাগের সেই দুর্নীতিবাজ শাহ মোহাম্মদ মারুফ ও তার ভাই শাহ আরিফের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেজন্য এনবিআরের কাছে তথ্য চেয়ে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে মারুফ চাকরির সময় যেসব কাগজপত্র ও সনদ জমা দিয়েছেন, কোথায় কোথায় চাকরি করেছেন-তার বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, শাহ মোহাম্মদ মারুফ ও শাহ আরিফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে সহকারী পরিচালক মো. সোহরাব হোসেন সোহেলকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। শাহ মারুফ ও তার ভাই শাহ আরিফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ অর্জন ছাড়াও দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। শাহ মারুফের দুর্নীতি ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরির অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে দুদকে মারুফের রেকর্ডপত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-মারুফের চাকরির পিডিএস ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের কপি, কর অঞ্চল বগুড়ায় যোগদান ও চাকরিতে যোগদানের সময় থেকে নেয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা, চাকরিতে যোগদানের সময় মুক্তিযোদ্ধার সনদসহ অন্যান্য সব সনদের সত্যায়িত কপি।

এনবিআর সূত্রমতে, শাহ মোহাম্মদ মারুফ ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরি জীবনে (বর্তমানে ৫ম গ্রেড) বেতন-ভাতা বাবদ সাকুল্যে তার আয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা। অথচ তার আয়কর নথিতে মোট সম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকার বেশি। পরিবার নিয়ে বসবাস দেশের অভিজাত এলাকা বারিধারা কূটনৈতিক জোনের ১২ কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাটে। স্ত্রীর নামে তিনি ফ্ল্যাটটি কিনলেও এখনো নিবন্ধন করেননি। নিজ ও স্ত্রীর ব্যবহারের জন্য আছে আলাদা বিলাসবহুল গাড়ি। নামে-বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদ। মারুফ ও তার স্ত্রীর নামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নেমেছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা উঠে আসায় চলতি বছরের ১০ এপ্রিল এনবিআর তাকে বরখাস্ত করে।

অভিযোগ রয়েছে, গোপালগঞ্জ বাড়ি হওয়ার দাপটে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর পরিচয়ে মাত্র ৭-৮ বছরের ব্যবধানে অবৈধ পথে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন মারুফ। অনুসন্ধানে অতিরিক্ত কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) শাহ মোহাম্মদ মারুফের নামে-বেনামে সম্পদ কেনার সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। ব্যাংকেও তার জমা আছে কোটি টাকা। ৮০ হাজার টাকা বেতনের সরকারি কর্মচারীর রাজধানীর বারিধারার কূটনৈতিক জোনে ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার খবর নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যেও চলছে নানা আলোচনা। এই কর্মকর্তা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্পদ কিনেছেন। তার সম্পদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে কর গোয়েন্দারা। এখন পর্যন্ত তারা শাহ মারুফের নামে-বেনামে (নিজ, স্ত্রী, ভাই-বোনের নামে) প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছেন। তবে মারুফের আয়কর নথিতে সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তার চাকরি ছাড়া আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই।

অনুসন্ধান বলছে, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় ১১ নম্বর সড়কে নজরকাড়া অভিজাত দশতলা একটি ভবনের নাম ‘বিটিআই উইন্ড ফ্লাওয়ার’। এই ভবনের সাততলায় পরিবার নিয়ে থাকেন শাহ মারুফ। প্রায় সোয়া আট কাঠা জমিতে নির্মিত এই ভবনের প্রতিটি তলায় একটি করে ইউনিট। আয়তন ৩ হাজার দুইশ বর্গফুট। বিদেশি বাথরুম ফিটিংস ও দামি আসবাবপত্রে সাজানো অ্যাপার্টমেন্ট। ভেতরে ঢুকলে যে কারও চোখ আটকে যাবে। ফ্ল্যাটটির ইন্টেরিয়রেই ব্যয় করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। ভবনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে-বাড়িটির প্রতি বর্গফুট জায়গার দাম ৪০ হাজার টাকা। সে হিসাবে মারুফের ফ্ল্যাটটির দাম হয় ১২ কোটি টাকার বেশি। আড়াই বছর আগে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাটটি কিনে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। তবে এক সময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা (বর্তমানে গৃহিণী) স্ত্রীর আয়কর ফাইলসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো ফ্ল্যাটটি নিবন্ধন হয়নি বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
Income Tax Intilligence
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মারুফের স্ত্রী সাদিয়া আফরিন চাকরিজীবী হিসাবে আয়কর ফাইল খোলেন। আয়কর নথি বলছে, সাদিয়া ইউনিয়ন ডেভেলপমেন্ট নামে একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানিতে চাকরি করেন। রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত ওই আবাসন কোম্পানির অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় সাদিয়া এই কোম্পানিতে চাকরি করলেও এখন নেই। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, বছরখানেক আগে চাকরি ছেড়েছেন সাদিয়া। সবশেষ তিনি বিক্রয় বিভাগের সহকারী ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে কর্মহীন সাদিয়ার আয়কর নথিতে সম্পদ এক কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে ব্যয় ও ১২ কোটি টাকায় ফ্ল্যাট কেনার তথ্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার পৈতৃক সূত্রে তার এই ফ্ল্যাট প্রাপ্তির কোনো তথ্য-প্রমাণও নেই।

কর গোয়েন্দারা জানান, তদন্তে পূর্বাচলের রূপগঞ্জ অংশের গোলাপ মৌজায় মারুফ ও তার দুই ভাইয়ের নামে ১৫ কাঠা জমির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া উত্তরায় ১৫ নম্বর সেক্টরে ৩ নম্বর রোডের ১২ নম্বর প্লটটি মারুফের (তিন কাঠা)। আর নিকুঞ্জে ৫ নম্বর রোডের ৪৮ নম্বর প্লটটি (তিন কাঠা) বোনের নামে কিনেছেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনের নামে আছে দুটি গাড়ি। স্ত্রীর গাড়ির দাম ৮০ লাখ টাকা। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে শাহ মারুফের বিরুদ্ধে। তদন্তে এসব সম্পদ অবৈধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ কর দিতে হবে। কর গোয়েন্দারা ইতোমধ্যে শাহ মোহাম্মদ মারুফকে শুনানিতে ডেকে সম্পদের তথ্য-উপাত্ত দাখিল করতে বলেছেন।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপালগঞ্জের পরিচিতিতে দাপটের সঙ্গে চাকরি করেন শাহ মারুফ। কর অঞ্চল-৪, কর অঞ্চল-৫, কর অঞ্চল-১২ ও নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের মতো লোভনীয় জায়গায় পোস্টিং নেন। করদাতাদের কর ফাঁকি দিতে সহযোগিতা করে তিনি অঢেল অবৈধ অর্থ আয় করেন। অবৈধ পথে উপার্জিত এই অর্থ বৈধ করতে তিনি নানা কায়দায় নামে-বেনামে সম্পদ কেনেন। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, কর অঞ্চল-৫ এ দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন।

** ৮০ হাজার টাকা বেতনের জেসি থাকেন ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে
** কর কমিশনার কবির উদ্দিন মোল্লার সম্পদের পাহাড়
** কর কমিশনার ও তাঁর স্ত্রীর অবৈধ সম্পদ অর্জন
** টাকা বৈধ করতে ‘কুমির-বাঘের’ ভয় দেখান কমিশনার!
** ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে কর কমিশনার বরখাস্ত
** উপ-কর কমিশনার মেহেদীর ছয় কোটি টাকার সম্পদ!
** কমিশনার রঞ্জিতের পরিবারের ১২৩ ব্যাংক হিসাব জব্দ
** বরখাস্ত তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে চিঠি
** কর পরিদর্শক সাইফুল: ১৮ বছরে বৈধ আয় ৪৩ লাখ, মালিক অর্ধ-শত কোটি টাকার
** কর কমাতে ডিসিটির ঘুষ ২৫ লাখ, ২৫ লাখ অফিসের
** রাজস্ব কর্মকর্তার ২৩ লাখ টাকা জব্দ, টাকার উৎস নেই