মিথ্যা ঘোষণা ব্যবহার করে দেশে গুঁড়ো দুধ আমদানি হচ্ছে। কখনও ইলেকট্রনিক পণ্য, বাদাম, অলিভ ইত্যাদি পণ্যের নামে, কখনও আবার বেবি ডায়াপারের নামে আমদানিকারকরা গুঁড়ো দুধ আনার চেষ্টা করছেন। কিছু অসাধু আমদানিকারক একশ্রেণির সিঅ্যান্ডএফের সহায়তায় বেবি ডায়াপারের সঙ্গে গুঁড়ো দুধ আমদানি করে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকটি কাস্টমস হাউসে বেবি ডায়াপারের আড়ালে গুঁড়ো দুধ আটক হওয়ার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তৎপর হয়ে উঠে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর সব কাস্টমস হাউসে বেবি ডায়াপার ও গুঁড়ো দুধের সব চালান খালাস স্থগিত করা হয়। তদন্তের মাধ্যমে বেশি চালান খতিয়ে দেখার পর কাস্টমস গোয়েন্দা এর প্রমাণ পায়। অসাধু আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফের নামসহ সম্প্রতি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুর রউফ এনবিআরকে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। এই তথ্য এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, ঢাকার মিরপুরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিয়াম ট্রেডিং। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে মালয়েশিয়া থেকে বেবি ডায়াপার ঘোষণায় ৬ টন ৮২৫ কেজি শিশুখাদ্য ল্যাকটোজেন আমদানি করে। তবে চালানে ঘোষিত ডায়াপার পাওয়া গেছে ২ টন ৮৮০ কেজি। মিথ্যা ঘোষণায় শিশুখাদ্য ল্যাকটোজেন আমদানির মাধ্যমে আমদানিকারক আনুমানিক ২২ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর শাখা ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনারটি আটক করে।
একই বছরে ঢাকার চকবাজারের সিয়াম এন্টারপ্রাইজ চট্টগ্রাম বন্দরে ১৩ হাজার ৫২০ কেজি চিনাবাদাম এবং ৪ হাজার ৫১০ কেজি জলপাই আমদানির ঘোষণায় একটি চালান আনে। এআরআই শাখা চালানটির খালাস স্থগিত করে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা শেষে উচ্চশুল্কের ২১ হাজার ৬০ কেজি শিশুখাদ্য গুঁড়ো দুধ আটক করে। অন্যদিকে ঢাকার প্রাইম ট্রেডিং দুবাই থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য ঘোষণায় দুই মেট্রিক টন পণ্য আমদানির চেষ্টা করে, পরে এআইআর শাখা সেই চালান থেকে নেসলের নিডো ব্র্যান্ডের আট মেট্রিক টন গুঁড়ো দুধ আটক করে। এভাবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণায়, বিশেষ করে ডায়াপার ঘোষণায়, গুঁড়ো দুধ আমদানি করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন কাস্টম হাউসে মিথ্যা ঘোষণায় গুঁড়ো দুধ আমদানির বিষয়ে বিশেষ করে ডায়াপার ঘোষণায় গুঁড়ো দুধ আমদানির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এ দপ্তরকে চিঠি দেয়া হয়। এছাড়া এ বিষয়ে বিশেষ তদারকির ব্যবস্থায় কায়িক পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এরপরই সব কাস্টম হাউসে ডায়াপার ঘোষণার সব পণ্য চালানের খালাস স্থগিত করা হয়। পরে এ-সংক্রান্ত ১১টি চালানের পণ্য যাচাই করা হয়। যার মধ্যে ৩টি চালানে ডায়াপারের সঙ্গে গুঁড়ো দুধ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের আমদানিকারক সিয়াম ট্রেডিং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রাজিব এন্টারপ্রাইজের সহায়তায় ৩ হাজার ৩০০ কেজি ডায়াপার ঘোষণা দেয়। কাস্টমস গোয়েন্দা কায়িক পরীক্ষা করে ৬ হাজার ৪৮০ কেজি ল্যাকটোজেন ও ল্যাকটোগ্রো দুধ আটক করে। রাজধানীর আমদানিকারক রয়েল ট্রেডিং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মাহি অ্যান্ড লামিয়া ট্রেডার্সের সহায়তায় ১১ হাজার ৫২০ কেজি ডায়াপার ঘোষণা দেয়। পরীক্ষা করে ১৫ হাজার ৩৫৫ কেজি পণ্য পাওয়া যায়। যার মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কেজি ল্যাকটোজেন পাওয়া গেছে। আমদানিকারক ইমপ্লাক্স ইন্টারন্যাশনাল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসএএস ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় ৬ হাজার ৮০ কেজি বেবি ডায়াপার ঘোষণা দেয়। কায়িক পরীক্ষা করে ১৩৯ কেজি ঘোষণা অতিরিক্ত ডায়াপার ও ৫২ কেজি গুঁড়ো দুধ পাওয়া যায়। এছাড়া সাতটি চালানে ঘোষণার অতিরিক্ত ডায়াপার পাওয়া গেছে। যার মধ্যে রয়্যাল ট্রেডিং ও ইমপ্লাক্স ইন্টারন্যাশনাল সাতটি চালানে ঘোষণার অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ ডায়াপার পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কাস্টম হাউস দিয়ে ডায়াপার ঘোষণায় খালাস হওয়া ৩০টি চালানের তথ্য দেয়া হয়। যাতে কয়েকটি চালানে ডায়াপার ঘোষণা দেয়া হলেও, সঙ্গে অন্যান্য পণ্য পাওয়া গেলেও গুঁড়ো দুধ পাওয়া যায়নি। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড থেকে এসব তথ্য নেয়া হয়েছে। আমদানিকারক ছিলেনÑট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, দি বিগ সোসাইটি, মাওলা ট্রেডার্স, ইমপ্লাক্স ইন্টারন্যাশনাল, এফপিএফ ফুডস, আয়েশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, অল মারকিন জেনারেল ট্রেডিং, রয়্যাল ট্রেডিং, রিয়েল কাম টেকনোলজি, কথা এন্টারপ্রাইজ, মীর এন্টারপ্রাইজ, মিটিক্স ডিজাইন ও এশিয়া বিজনেস করপোরেশন। আর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হলো এসএএস ইন্টারন্যাশনাল, এসটি ট্রেডিং বিডি লি., এইচ কে ট্রেডিং।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করে বলা হয়, মাঝে মধ্যে কিছু আমদানিকারক বেবি ডায়াপার বা ডায়াপারের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ডায়াপারের সঙ্গে সুকৌশলে গুঁড়ো দুধ আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করেছেন। তাই বেবি ডায়াপার ঘোষণায় আমদানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে রাজস্ব ফাঁকি রোধে বিভিন্ন কাস্টম হাউস দিয়ে আমদানি করা পণ্যচালান শুল্কায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বে কাস্টমস গোয়েন্দার আঞ্চলিক কার্যালয় ও সার্কেল অফিসকে নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে। এছাড়া এ ধরনের পণ্য চালান শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সব কাস্টম হাউসকে নির্দেশনা দিতে অনুরোধ করা হয়।
