যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা মালিকবিহীন পণ্য জব্দের পর কাস্টমস গুদামে রাখা হলেও পরে সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে বের করা হয়; তবে পথে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সেগুলো আবার জব্দ করে। বেনাপোল কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বন্দরে পণ্য চুরি ও জালিয়াতির ১৩০টি মামলা হয়েছে এবং এতে জড়িত কয়েকটি ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। বন্দরের ৪১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনার কারণে আমদানি-রপ্তানিকারকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। যদিও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি, চুরির ঘটনা বাড়েনি; বরং তারা ঘটনাগুলো প্রকাশ করায় বিষয়টি বেশি আলোচনায় আসছে।
ত্রাণ তহবিল কেলেঙ্কারি যেভাবে সামনে
বন্দরের সব গুদাম ও ইয়ার্ড বন্দর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকলেও কাস্টমসের নিজস্ব একটি গুদাম রয়েছে, যেখানে জব্দ পণ্য সংরক্ষণ করা হয়। গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে ওই গুদাম থেকে একটি কাভার্ড ভ্যানে পণ্য বের করা হলে বেনাপোল বাজার মোড়ে বিজিবির যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯-বিজিবি) সেটি আটক করে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় গাড়িটি জব্দ করা হয় এবং কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ, চালক ও তার সহকারীকে আটক করা হয়। পরে বিজিবি বেনাপোল বন্দর থানায় মামলা করে। জব্দ করা গাড়িটিতে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস এবং আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ পাওয়া যায়। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কাস্টম হাউসের দুজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সিপাহিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ‘বিভাগীয় তদন্ত চলছে। পণ্য চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যেভাবে চুরি হয়
ভারত থেকে ১০০ প্যাকেজ বেকিং পাউডার আমদানির ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ১০৮ প্যাকেজ শাড়ি, থ্রি-পিস, শিশুর পোশাক ও প্রসাধনসামগ্রী আমদানি করে সাফা ইমপেক্স ও হুদা ইন্টারন্যাশনাল। এসব পণ্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মো. হাসনাইন ক্লিয়ারিং করেন। ১২ মার্চ থেকে ২ জুন পর্যন্ত দফায় দফায় পরীক্ষার পর কাস্টমস পণ্যগুলো জব্দ করে বন্দরের ৩৭ নম্বর গুদামে সংরক্ষণ করে। তবে পরবর্তীতে ওই পণ্যগুলো গুদাম থেকে উধাও হয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ৯ জুন কাস্টমস বেনাপোল বন্দর থানায় মামলা করে, যেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষের তিনজন ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট ও একজন ট্রাফিক পরিদর্শকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।
এর আগে ৪১ নম্বর গুদাম থেকেও গত ১৬ থেকে ২১ মে’র মধ্যে জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজের আমদানি করা মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৪ জুন কাস্টম হাউসের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, পণ্য চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট, পণ্য ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং এজেন্ট এসএ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সোহাগসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৮-১০ জন জড়িত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সোহাগ বলেন, তার স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত থাকায় তিনি কিছু বলতে পারছেন না এবং ব্যবসার দেখভাল কর্মচারীরাই করেন; তবে তিনি জানেন, কাস্টমস কমিশনার তার লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করেছেন।
চুরিতে জড়িত জড়িত
সাম্প্রতিক পণ্য চুরির পাঁচটি মামলার এজাহার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব চুরি ও পাচারকাণ্ডে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টম হাউসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দুটি মামলায় কাস্টমসের পাঁচ কর্মকর্তা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। পাশাপাশি জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় দুইজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সিপাহিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এজাহারগুলোতে কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পণ্য ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টসহ বিভিন্ন পক্ষের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বন্দরে এমন চুরির ঘটনার কথা স্বীকার করেন কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বন্দরে পণ্য চুরির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। বন্দর কর্তৃপক্ষের গুদাম রক্ষকেরাও কয়েকটি চুরির সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। এ বিষয়ে ফৌজদারি কয়েকটি মামলাও হয়েছে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেনাপোল বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘বন্দরের গুদাম থেকে পণ্য চুরি ঠেকাতে আমরা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছি। এখনকার চেয়ে আগে চুরির ঘটনা বেশি ঘটত। গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হতো কম। কিন্তু এখন উল্টো। আমরা এখন গণমাধ্যমে নিজেরাই প্রকাশ করে দিচ্ছি। এতে মনে হতে পারে, চুরি বেড়েছে। আসলে চুরি বাড়েনি।’
বন্দর সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ চুরির সঙ্গে বড় সিন্ডিকেটও জড়িত। এর সঙ্গে শুধু কাস্টমস কর্মকর্তারাই না, বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়্যারহাউস সুপার বা গুদাম ইনচার্জ, ট্রাফিক পরিদর্শকসহ কর্মকর্তাদের অনেকে এই চুরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘চুরির সঙ্গে যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট নেই, তা আমি বলব না। রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট—সর্বোপরি কিছু কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন। তবে আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না।’
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
বেনাপোল বন্দরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ৪১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও ফুটেজ পাওয়া নিয়ে জটিলতা রয়েছে। বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান জানান, গুদাম থেকে পণ্য চুরির ঘটনায় ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্টদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে ফুটেজ চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে বেনাপোল বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, তারা ফুটেজ দিতে আগ্রহী, তবে বিপুলসংখ্যক ক্যামেরা তৃতীয় পক্ষ পরিচালনা করায় এটি একটি প্রযুক্তিগত বিষয়; নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করতে হয় এবং এসব কারণে অনেক সময় ফুটেজ পেতে বিলম্ব হয়।
এমন সমন্বয়হীনতার কারণে চুরি আরও বাড়ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারী সারথী লজিস্টিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা এবং এরপর তা সরিয়ে ফেলার এই প্রতিযোগিতার কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় অনেক আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এই বন্দর দিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন।’
