পছন্দের আমলাদের খুশি করতে ২০১২ সালে জ্যেষ্ঠ সচিব পদ সৃষ্টি করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদটি বিলুপ্তির সুপারিশ রেখে আজ বুধবার প্রতিবেদন দিতে যাচ্ছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এতে গ্রেড-১-এর মান সচিব পদমর্যাদায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব ও গ্রেড-১ মিলে হবে একটি পদ ‘সচিব’। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জনপ্রশাসন সংস্কারে প্রতিবেদনে কমিশন শতাধিক সুপারিশ করেছে।
অষ্টম বেতন কাঠামোয় সচিবদের মূল বেতন ৭৮ হাজার, আর জ্যেষ্ঠ সচিবদের ৮২ হাজার টাকা নির্ধারিত হলেও পেনশনে এই বাড়তি টাকা যোগ হয় না। মূলত সম্মানসূচক পদ হিসেবে ২০১২ সালে জ্যেষ্ঠ সচিব পদ তৈরি করা হয়, যা শুরুতে ৮টি থাকলেও পরে ১২টি করা হয়।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের এক সদস্য জানান, জ্যেষ্ঠ সচিব পদে পদোন্নতিতে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার নীতি মানা হয়নি, বরং সরকার ঢালাওভাবে এই পদ দিয়েছে, যা বিতর্ক তৈরি করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় নিয়মের মধ্যে রাখতে এবং নির্দিষ্ট মর্যাদা নির্ধারণ করতেই এই পদ বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচে মোট কর্মকর্তা ছিলেন ১৯১। তাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সচিব সুরাইয়া বেগম মেধাতালিকায় ১৭৮তম হয়েও জ্যেষ্ঠ সচিবের পদোন্নতি পান। একই সঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইএমইডি, পরিসংখ্যান বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও পেয়েছিলেন। এর পর অবসরে গিয়ে তথ্য কমিশনার হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন সুরাইয়া। অথচ মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি হলে সুরাইয়া বেগম সচিবও হতে পারতেন না।
গ্রেড-১ পদকে ‘সচিব’ হিসেবে নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা গ্রেড-১ পদে সচিব পদমর্যাদায় পদোন্নতি পাবেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের সরকারি কর্মচারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে মন্ত্রণালয় ও বিভাগে গ্রেড-১-এর আওতায় অনুমোদিত পদ রয়েছে ৯০টি।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, জ্যেষ্ঠ সচিব বিলুপ্তির প্রস্তাব হলে ভালো হবে। কারণ, এ পদ সৃষ্টির পর নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি হয়নি। অবশ্য জ্যেষ্ঠ সচিব পদ রাখতে হলে ভারত-পাকিস্তানের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। আবদুল আউয়াল আরও বলেন, সংস্কার কমিশন অন্যান্য দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়নি। এটা ঠিক হয়নি। বাংলাদেশ তো অন্যান্য দেশ বা পদ্ধতির বাইরে নয়।
জানা গেছে, অন্যান্য দেশের পদ্ধতিকে গুরুত্ব না দিলেও সংস্কার কমিশন উপসচিব পদে পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডারের জন্য ৫০ শতাংশ কোটার সুপারিশ রেখেছে। তবে আমলাদের আন্দোলনের কারণে উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির প্রস্তাব রাখছে না। আর ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে ৫০ শতাংশ কোটার সুপারিশ করা হয়েছে ।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গত ১৭ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে। সেখানে কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেছিলেন, এখন থেকে উপসচিব ও যুগ্ম সচিবরা পরীক্ষা ছাড়া পদোন্নতি পাবেন না। পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা নেবে। ৭০ নম্বর না পেলে পদোন্নতি পাবেন না। এ ছাড়া উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ সুপারিশ করা হচ্ছে। বর্তমানে উপসচিব পদে পদোন্নতিতে ৭৫ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডারের জন্য সংরক্ষিত; বাকি ২৫ শতাংশ কোটা অন্য ক্যাডারের। তাঁর এ বক্তব্যে প্রশাসন ক্যাডারের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা উপসচিব পদে কোটা বাতিলের দাবি করেছেন।
কমিশন সব ক্যাডারের সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তবে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সমন্বয়ক মফিজুর রহমান বলেন, কমিশন সিভিল সার্ভিসের প্রত্যেক ক্যাডারের জন্য হয়েছে। অথচ তারা এককভাবে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের মত নিয়েছে। অন্যান্য ক্যাডারের মতামত এভাবে নেয়নি। তারা কী প্রস্তাব দেবে জানি না। তবে আমরা আমাদের দাবি উপদেষ্টাদের জানিয়েছি। তারা বলেছেন, আগে সুপারিশ আসুক, এরপর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চূড়ান্ত বৈঠক হয়। পরে কমিশনপ্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে কমিশনের প্রতিবেদনে শতাধিক সুপারিশ থাকছে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব। কাজের কারণে আমাদের প্রতিবেদন গত মাসে দিতে পারিনি। মাঠে গেছি, লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি, জেলা-উপজেলায় কথা বলেছি, অনলাইনে মতামত নিয়েছি। এগুলোর ভিত্তিতে আমরা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে স্বাক্ষর করব। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করব।
এ সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান বলেন, প্রতিবেদন জমার পর সেটি হবে পাবলিক ডকুমেন্ট। ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে, সবাই জানবেন। ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।
জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়তে সরকার গত ৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এতে প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে। প্রথমে ৮ সদস্যের এই কমিশনের সদস্য সংখ্যা পরে বাড়িয়ে ১১ করা হয়।
