** তিন অর্থবছর প্রায় ২৯ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে ডিপিডিসি
** প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিক্রির তথ্য ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়নি, ভ্যাট ফাঁকি প্রায় ৩৬ কোটি টাকা
** অপারেটিং ইনকাম এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের উপর প্রায় তিন কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি
বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ওই বিদ্যু বিক্রিতে গ্রাহক থেকে ভ্যাটও নেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। একে একে তিন বছরে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিক্রির তথ্য ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়নি। শুধু বিদ্যুৎ বিক্রি হয়, অপারেটিং ইনকামের উপর সঠিকভাবে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার উপর পরিশোধ করা হয়নি উৎসে ভ্যাট। তিন বছরে বছরে প্রায় ৪১ কোটি ২৬ লাখ টাকার ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) বিরুদ্ধে এই ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। ফাঁকি দেওয়া এই ভ্যাট পরিশোধ করতে ডিপিডিসিকে সম্প্রতি দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, ডিপিডিসির নিরীক্ষা করতে এলটিইউ ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল নিরীক্ষা দল গঠন করে। নিরীক্ষা দলের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। যাতে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন (সিএ রিপোর্ট), মাসিক দাখিলপত্র (ভ্যাট রিটার্ন) ও ভ্যাট সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা হয়। যাচাইয়ে ডিপিডিসির ভ্যাট ফাঁকি ও অনিয়ম উঠে আসে। নিরীক্ষা শেষে ওই বছরের ২৮ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধে দাবিনামা জারি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপিডিসি ২০২২-২৩ অর্থবছরের সিএ রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ মূল্য দেখিয়েছে ৮ হাজার ৭৩৭ কোটি ৩৩ লাখ ১৬ হাজার ৪৪৮ টাকা। কিন্তু সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী ‘ক্যাশ কালেকশান ফ্রম কনজ্যুমার’ ৮ হাজার ৬৭১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার ৬৪৭ টাকা দেখানো হয়েছে। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছর সরবরাহ মূল্য ১০ হাজার ৩২০ কোটি ৮ লাখ ৩৭ হাজার ১২০ টাকা দেখানো হলেও কিন্তু সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী ‘ক্যাশ কালেকশান ফ্রম কনজ্যুমার’ ১০ হাজার ১৯৫ কোটি ৩০ লাখ ৩৯ লাখ ৩২৮ টাকা দেখানো হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর সরবরাহমূল্য ১১ হাজার ২২৪ কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার ৩৩২ টাকা দেখানো হলেও সিএ রিপোর্টে ‘ক্যাশ কালেকশান ফ্রম কনজ্যুমার’ ১১ হাজার ২২৭ কোটি ৭৪ লাখ ২ হাজার ৯৯৫ টাকা দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষা দলের কর্মকর্তারা, প্রতিষ্ঠানটির সিএ রিপোর্টে থাকা ‘ক্যাশ ফ্লো ফ্রম অপারেটিং এর ক্যাশ কালেকশান ফ্রম কনজ্যুমার অ্যাগেনিস্ট সেলস অব ইলেক্ট্রিসিটি ও ক্যাশ কালেকশান ফ্রম আদার অপারেটিং ইনকাম’ কে প্রকৃত সরবরাহ বা বিক্রয়মূল্য হিসেবে বিবেচনা করেছে।
সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ক্যাশ কালেকশান ফ্রম কনজ্যুমার অ্যাগেনিস্ট সেলস অব ইলেক্ট্রিসিটি’ ও দাখিলপত্রে প্রদর্শিত বিক্রয়মূল্য তুলনা করা হয়েছে। যাতে দেখা গেছে, ডিপিডিসি ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত-এই তিন অর্থবছর ক্যাশ কালেকশান ফ্রম কনজ্যুমার অ্যাগেনিস্ট সেলস অব ইলেক্ট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ বিক্রি দেখিয়েছে ২৯ হাজার ৯৬৪ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার ৯১৫ টাকা। যার মধ্যে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেবার সরবরাহ মূল্য ৭১০ কোটি ৬১ লাখ ৭৮ হাজার ১৬১ টাকা, আদর্শ হার ব্যতীত ভিন্ন করহারে সরবরাহমূল্য ২৮ হাজার ৫২৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭ হাজার ২৫ টাকা। বাকি ৭৩০ কোটি ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৯ টাকা বিদ্যুৎ বিক্রির তথ্য ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়নি। এই অপ্রদর্শিত বিক্রয়মূল্যের উপর ৫ শতাংশ হারে অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮৬ টাকা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী এই তিন অর্থবছর ‘ক্যাশ কালেকশান ফ্রম আদার অপারেটিং ইনকাম’ দেখানো হয়েছে ১৩০ কোটি ১৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৫ টাকা। কিন্তু দাখিলপত্র অনুযায়ী আর্দশ হার ১২০ কোটি ১২ লাখ ৭৯ হাজার ২৮৬ টাকা। অর্থাৎ সিএ রিপোর্টের তুলনায় দাখিলপত্রে ‘ক্যাশ কালেকশান ফ্রম আদার অপারেটিং ইনকাম’ হিসেবে ১৫ কোটি ৫১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬১ টাকা কম দেখানো হয়েছে। যাতে ১৫ শতাংশ হারে ২ কোটি ৩২ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি। ডিপিডিসি একটি লিমিটেড কোম্পানি। ভ্যাট আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার উপর উৎসে ভ্যাট প্রযোজ্য। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির এই তিন অর্থবছর ব্যয় বা কেনাকাটার উপর প্রযোজ্য উৎসে মূসক ২৬২ কোটি ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯৯ টাকা। যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার ৪৪৪ টাকা পরিশোধ করেনি। বিদ্যুৎ বিক্রি, অপারেটিং ইনকাম ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের উপর এই তিন অর্থবছর ডিপিডিসি মোট ৪১ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার ২৯৫ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। অপরিশোধিত এই ভ্যাট বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান কোন কাগজপত্র বা প্রমাণ দেখাতে না পারলে এই ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া ফাঁকি প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হবে।
এই বিষয়ে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধে দাবিনামা জারি করা হয়েছে। ডিপিডিসির মতো প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিক্রি করে ভ্যাট আদায় করেছে। কিন্তু সেই ভ্যাট দেয়নি, যা দু:খজনক। ফাঁকি প্রমাণ হলে ভ্যাট আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হবে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুন নাহারকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বক্তব্যের বিষয় দেওয়া হলে তিনি সিন করেন। কিন্তু কোন জবাব দেননি। একইভাবে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ হায়দার আলীকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বক্তব্যের বিষয় দেওয়া হলে তিনি সিন করেন। কিন্তু কোন জবাব দেননি।
