Header – Before
Header – After

বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না সরকার

অন্তর্বর্তী সরকার আপাতত বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাইছে না। ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আইএমএফের প্রতিনিধি দলকে এই অবস্থান জানানো হয়েছে। সরকারের ধারণা, এখন বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হলে চলমান মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়ে জনদুর্ভোগ বাড়বে। তবে মিশনকে জানানো হয়েছে, সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানোর উদ্যোগ চলমান থাকবে।

ঢাকা সফররত আইএমএফের গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রোইকোনমিকস বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল কয়েক দিন ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করার পর বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ‘মিড মিশন ব্রিফ’ সভা করেছে। সচিবালয়ে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। মিশনটি রাজস্ব বৃদ্ধির ব্যবস্থা, ভর্তুকি হ্রাস, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের জন্য সরকারি অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছে। সভাসূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আইমএমএফ মিশনকে জানিয়েছেন আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় না। এর আগে প্রতিনিধি দলটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করে। বৈঠকে আইএমএফ মিশন জানতে চায়, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়াতে সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা।

বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আইএমএফ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তারা নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবেন। তারা বলেছেন, চলমান অভ্যন্তরীণ সংস্কার কর্মসূচি সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকিও কমে আসবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ভর্তুকিতে ব্যয় করা হয় ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলো বাজেটের অধীনে প্রদত্ত ভর্তুকি কমিয়ে ২০২৭ সাল নাগাদ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।

মিড মিশন ব্রিফ সভায় আইএমএফ প্রতিনিধি দল দেশের ব্যাংক খাতের সংস্কার আরও দ্রুত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ, একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে দিচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। তবে বিকল্প খুব বেশি না থাকায়, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই অর্থ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মিশনের কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শেষ না করলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে এবং একীভূতকরণের সুফল পাওয়া নাও যেতে পারে।

সভায় আইএমএফ প্রতিনিধি দল সরকারের ব্যয় নির্বাহে ঋণ কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করার গুরুত্বে জোর দিয়েছেন। কারণ, এই ঋণ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর সরকার প্রায় প্রতিটি প্রান্তিকে আইএমএফের নির্ধারিত কর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ষষ্ঠ কিস্তির জন্য আইএমএফের দেওয়া প্রায় সব শর্ত পূরণ হলেও কর রাজস্ব এবং সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সফররত প্রতিনিধি দল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। বৈঠকগুলোতে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব এলে এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ের আগে নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান কর ছাড় প্রত্যাহার করা হবে না। আইএমএফ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত থাকবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বছরের মাঝামাঝি কোনো কর বাড়ানো বা হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকারের বিদ্যমান সানসেট নীতির আওতায় নির্ধারিত মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত করছাড় অব্যাহত থাকবে। তারা আরও বলেন, সব পণ্য ও সেবার ওপর একযোগে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। কারণ এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অত্যাবশ্যকীয় খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরকার গত জানুয়ারিতে রাজস্ব বাড়াতে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী প্রায় ১০০টি পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ বারবার নেওয়া সম্ভব নয়। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ পণ্য ও সেবা ইতোমধ্যেই ১৫ শতাংশ ভ্যাটের আওতায় রয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, রেমিট্যান্স-সংশ্লিষ্ট সেবা, পোলট্রি ও মৎস্য খাত এবং কিছু স্বাস্থ্যসেবা কম হারে করযোগ্য বা করমুক্ত। এসব খাতে একযোগে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়ে যাবে। তাই আইএমএফ দলকে জানানো হয়েছে, হঠাৎ করে নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি আদর্শ ভ্যাট কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে। তবে গত জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি অনুমোদনের মাধ্যমে মূল ঋণের পরিমাণ ৮০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫০ কোটি ডলার হয়েছে। মোট আট কিস্তিতে এই অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে। ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ার আগে শর্ত পূরণের অগ্রগতি ও সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য মিশন ২৯ অক্টোবর থেকে ঢাকা সফর করছে। প্রতিনিধি দলের মিশন আগামী ১৩ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।