বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাড়ায় রিজার্ভে চাপ

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। পুরোনো প্রকল্পগুলোর ঋণছাড় চললেও লক্ষ্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, আর প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর। অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। রোববার (৩০ নভেম্বর) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বৈদেশিক ঋণ, অনুদান, প্রকল্প সহায়তা ও ঋণ পরিশোধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

ইআরডির চার মাসের প্রতিবেদনে সার্বিক চিত্র অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর এবং ঋণ পরিশোধের বোঝা বেড়েছে। বড় অংশীদাররা—রাশিয়া, চীন, জাপান ও ভারত—নতুন কোনো চুক্তি না করলেও পুরোনো প্রকল্পে অর্থছাড় অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিশ্রুতি অস্বাভাবিকভাবে কম, আর ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে । গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ২৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ সহায়তার প্রতিশ্রুতি প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। এখানে সবচেয়ে বড় অবদান এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি)। এডিবি মোট ৫৮ কোটি ১৭ লাখ ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা মোট প্রতিশ্রুতির প্রায় ৪৮ শতাংশ। এর বাইরে ইউরোপীয় অংশীদারদের প্রতিশ্রুতি ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার আর এশিয়া, জাপান ইকোনমিক কো-অপারেশন জেইসি ও ফ্রেন্ডশিপ অ্যান্ড ফ্রেমওয়ার্ক উইং ৩২ কোটি ৫৯ কোটি ডলার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক (আইডিএ) থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১ কোটি ২৪ লাখ ডলার, যা অস্বাভাবিকভাবে কম। এর মধ্য দিয়ে আলোচনাধীন প্রকল্পগুলোতে ধীরগতি বা নতুন চুক্তির স্বল্পতার ইঙ্গিত মেলে।

বিদেশি সহায়তার মোট অর্থছাড় চলতি বছর ১৬৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলার হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে পাওয়া ১২০ কোটি ২০ লাখ ডলারের চেয়ে বেশি। তবে সমস্যা হলো—এই বছরের মোট বাজেট লক্ষ্য ছিল ৯২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে প্রথম চার মাসে বাস্তবায়ন মাত্র ১৮ শতাংশ। উইং-ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমেরিকা ও জাপান থেকে বাজেটে বরাদ্দ ১৫৮ কোটি ২০ লাখ ডলার ছিল, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র ৮ কোটি ডলার। এডিবি থেকে বরাদ্দ ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বিপরীতে এসেছে ২৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।

তবে ইউরোপ তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করেছে। বাজেটে ধরা ১৭২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিপরীতে তাদের অর্থছাড় হয়েছে ৪৯ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাংক (আইডিএ)-এর বাজেট ১৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বিপরীতে অর্থছাড় হয়েছে ৪০ কোটি ৫২ লাখ ডলার। অর্থাৎ বড় অংশীদারদের কাছ থেকে অর্থছাড়ের গতি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। পুরোনো বড় প্রকল্পে রাশিয়া, চীন ও ভারতের নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি না এলেও পূর্ববর্তী প্রকল্প থেকে রাশিয়া, চীন, ভারত ও জাপানের অর্থছাড় অব্যাহত আছে। হালনাগাদ হিসাবে দেখা যায়, এই চার মাসে রাশিয়া ৪০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, চীন ১৯ কোটি ৪০ লাখ, ভারত ৮ কোটি ১৮ লাখ এবং জাপান ৮ কোটি ডলার অর্থছাড় করেছে। এই চার দেশ থেকে এ সময়ে কোনো নতুন ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি আসেনি; সবই পুরোনো অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থছাড়।

ইআরডির প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই সুদ ও আসল মিলিয়ে বাংলাদেশকে ১৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধ প্রায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার বৃদ্ধির চাপও বেড়েছে।