বিদেশি ঋণের ৯২% ব্যয় পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধে

বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ছাড় হওয়া বৈদেশিক ঋণের ৯২ শতাংশই পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনেও এ চিত্র উঠে এসেছে।

ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট ৩৮৯ কোটি ১ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ ও সহায়তার অর্থ ছাড় হয়েছে। এই সময়ে সরকারকে ৩৫২ কোটি ৫ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ শোধ করতে হয়েছে। সে হিসাবে সরকারের ঋণের তহবিলে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৩৬ কোটি ৬ লাখ ডলার।

জানা গেছে, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানসহ বিভিন্ন দাতার ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। অর্থছাড়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে সুদ-আসল পরিশোধের চাপ, ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ শোধের বোঝাও ক্রমশ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়—দুটিই কমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় কমেছে ১৯ শতাংশ এবং ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ইআরডির কর্মকর্তার জানান, নির্বাচনের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের ছাড় এমনিতেই কম হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখনও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। আবার চলমান অনেক প্রকল্প নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মূলত এসব কারণেই বিদেশি অর্থছাড় কমেছে।

জানা গেছে, বিদেশি ঋণের পাশাপাশি দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেও ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়; পরবর্তীতে আংশিক পরিশোধের ফলে তা কমে ৯৩ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এর ফলে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি দেশীয় ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ঋণ পরিশোধ মূলত নির্ভর করে মোট ঋণের পরিমাণের ওপর। প্রতিটি ঋণচুক্তিতে নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষে আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়, যা সাধারণত ঋণ নেওয়ার এক থেকে দুই বছর পর শুরু হয়। ঋণের পরিমাণ যত বেশি হয়, ততই কিস্তির চাপ বাড়ে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যাপক ঋণ নেওয়া হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকায় দেশের সামগ্রিক ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির ওপর এই ঋণের চাপের বিষয়টি নির্ভর করে আমাদের বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির ওপর। যদি ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করে দেশে উৎপাদন এবং বিদেশে পণ্য পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানো যায় তবে ঋণ পরিশোধে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু ঋণের টাকা যদি অপচয় করা হয় তবে অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ে না। অথচ ঋণ ঠিকই পরিশোধ করতে হয় যা অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে। মুস্তফা কে মুজেরি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচুর ঋণ নেওয়া হলেও তার পাশাপাশি ব্যাপক দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সেই অনুপাতে সক্ষমতা বাড়েনি যা বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চার বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই ধারায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হলে এ বছর বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলার পার হতে পারে।

ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণছাড় করেছে রাশিয়া। দেশটি দিয়েছে প্রায় ৮৩ কোটি ডলার। এরপর আছে বিশ্বব্যাংক। এই সংস্থা দিয়েছে সাড়ে ৭৬ কোটি ডলার। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে প্রায় ৬১ কোটি ডলার। চীন ও ভারত ছাড় করেছে যথাক্রমে ৫২ কোটি ডলার ও ২৪ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে ৩১ কোটি ডলার। সরকার বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নেয়। এ ছাড়া বাজেট সহায়তা হিসাবের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দেয়।

অর্থনৈতিক নানা সংকট, অর্থ পাচার এবং অনিয়ম-দুর্নীতির প্রভাবে ২০২০ সালের পর থেকেই দেশের অর্থনীতি দুর্বল হতে শুরু করে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে তীব্র ডলার সংকট দেখা দেয়, যা দ্রুতই গভীর আকার ধারণ করে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৪০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা নিতে হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে। কঠোর শর্ত মেনে সংস্থাটির সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করা হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৫ মাসে দেশের বৈদেশিক ঋণ আরও ৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে।