Header – After

বিডায় বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ

বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) দেশের দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের শুরুতেই নিবন্ধনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিনিয়োগে নিবন্ধন বা ইচ্ছাপ্রকাশ এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা মোট জিডিপির মাত্র ২–৩ শতাংশ। তবে সেবা সংযোগের বিলম্ব, জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য লজিস্টিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রকৃত নিবন্ধন তার অর্ধেক বা তারও কম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে বিনিয়োগ পরিবেশে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট দেখা দেয়। ফলস্বরূপ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার ও সামিট আয়োজনের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা দেখা গেছে। এসব আয়োজনের ভালো সাড়া পাওয়ার কথাও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) প্রচার করেছে, তবে বাস্তবে তার প্রতিফলন কম। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ৬৬,০৫৭ কোটি টাকার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব বিডায় নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কম। এ সময়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলানোর উচ্চাশার পরিবর্তে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো সমাধান করাই অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল। বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয় নিবন্ধনের মাধ্যমে, এরপর বিনিয়োগকারীরা সরকারি অনুমোদন, অর্থায়ন সংগ্রহ ও অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে নিবন্ধনেই বিনিয়োগকারীর আগ্রহ প্রতিফলিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় ৯৭০টি প্রকল্পে ৬৬,০৫৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১,০৬৪টি প্রকল্পে ১,৫৬,৯৯৮ কোটি টাকার প্রস্তাব ছিল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে।

কভিডকালের তুলনায় গত অর্থবছরে দেশে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ আরও কমে গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯০৫টি প্রকল্পে মোট ১ লাখ ৫,২২৬ কোটি টাকার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কম। পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে, কভিডকালের প্রভাবে প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে ১,০৯৫টি হলেও টাকার দিক থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রায় ৩৮ শতাংশ কমে ৬৫,৫৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের সংখ্যা ও বিনিয়োগ প্রস্তাব উভয়ই বৃদ্ধি পায়; ওই অর্থবছরে ১,১২৪টি প্রকল্পে ১,৪১,৪৩২ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১,০১৬টি প্রকল্পে ১,১৫,০৭৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়, যা প্রায় ১৯ শতাংশ কম। গত অর্থবছরে নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে ৮০৯টি প্রকল্পে ৫২,০৩৫ কোটি টাকার প্রস্তাব এসেছে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে ৩২ শতাংশ এসেছে সেবা খাতে, ১৭ শতাংশ কেমিক্যাল খাতে, ১৪ শতাংশ বস্ত্র খাতে এবং ১০ শতাংশ প্রক্রৌশল খাতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ১৬১টি প্রকল্পে মোট ১৪,০২২ কোটি টাকার প্রস্তাব নিবন্ধন করেছেন, যার ৫৫ শতাংশ কেমিক্যাল খাতে এসেছে। অন্যান্য খাতে প্রক্রৌশল খাতে ২৫ শতাংশ, সেবা খাতে ৮ শতাংশ এবং বস্ত্র খাতে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।

দেশে বিদেশী বিনিয়োগ সাধারণত তিনটি উপখাতের মাধ্যমে হিসাব করা হয়, যার মধ্যে রিইনভেস্টেড আর্নিংস এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের অংশই সবচেয়ে বড়। তবে বিদেশী বিনিয়োগের প্রকৃত প্রতিফলন মূলত ইকুইটি ক্যাপিটালে ঘটে, যা নতুন মূলধন হিসেবে আসে। নিয়মিতভাবে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ না আসায় এই হিস্যা সাধারণত কম থাকে। গত অর্থবছরে শুধু বিনিয়োগ প্রস্তাবই কমেনি, ইকুইটি মূলধনের প্রবাহও কমেছে। উল্লিখিত অর্থবছরে দেশে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার ইকুইটি মূলধন এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। এফডিআই স্টক বিবেচনায়, বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগ উৎস দেশ হলো চীন। প্রধান উপদেষ্টা গত বছরের মার্চে বেইজিং সফরে যান, এবং পরের মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নেন অনেক চীনা বিনিয়োগকারী। জুলাইয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চীনে সফরে যান এবং সাংহাইয়ে বিডার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে নেতৃত্ব দেন। সেখানে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ-চায়না ইনভেস্টমেন্ট সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে চৌধুরী আশিক চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, টেক্সটাইল ও আইটি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান। এই সফরগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের আগ্রহ এবং প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গেছে। তবে বাস্তবে গত অর্থবছরে চীনা বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ ৮৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দেশে চীনের নিট এফডিআই প্রবাহও কমে ৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

দেশভিত্তিক বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও জার্মানি শীর্ষে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ দেশগুলোর মধ্যে চীন ছাড়া আর কেউ শীর্ষ পাঁচে ছিল না। গত অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এরপর চীন থেকে এসেছে ৬২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব, যেখানে আগের অর্থবছরে এসেছিল ৫ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪১০ কোটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩১০ কোটি ও হংকং থেকে ২২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।

দ্য ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) প্রেসিডেন্ট এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের এমডি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, ২০২৩ সালের শেষের দিকে টাকার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যবসার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সেই সঙ্গে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার থাকায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন, কারণ তারা সবসময় স্থিতিশীল সরকার চান। তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপালী হক চৌধুরী আরও জানান, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এমন খাতে মনোযোগ দেওয়া দরকার যা স্থানীয় ভোগের পাশাপাশি রফতানিও নিশ্চিত করবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘদিনের দাবির পর সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করলেও তার সঙ্গে যেসব আনুষঙ্গিক সুবিধা দেওয়া উচিত ছিল তা প্রদান হয়নি। এছাড়া, বিডার ওয়ানস্টপ সমাধান কার্যকর হয়নি। এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।