** ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পল্লী বিদ্যুতের কাছে ক্যাবল পণ্য বিক্রির ৭ ধাপে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে
** নারায়ণগঞ্জের মোগড়াপাড়া সার্কেলের রাজস্ব কর্মকর্তার সই জাল করে নথি তৈরি করা হয়েছে
** ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার পরও মেঘনার অস্বীকার, শেষে তদন্ত প্রতিবেদনে ফাঁকি প্রমাণিত
ভ্যাট ফাঁকি দিতে প্রকৃত বিক্রয় গোপন করা হয়েছে। সেই গোপন বিক্রি ঢাকতে কর্মকর্তার সই জাল করে নথি তৈরি করা হয়েছে। এত জালিয়াতির পরও শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে তদন্তে প্রকৃত বিক্রয় গোপন ও সই জালিয়াতির বিষয়ে উঠে এসেছে। সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকিও উঠে এসেছে। বিক্রয় গোপন, কর্মকর্তার সই জালিয়াতির কাজটি করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আল মোস্তফা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা স্টার ক্যাবলস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপলায়েন্স লিমিটেড। ঢাকা পূর্ব ভ্যাট কমিশনারেটের তদন্তে এই জালিয়াতি ও ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ উঠে এসেছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রমতে, মেঘনা ক্যাবলসের বিরুদ্ধে বিক্রয় গোপন ও কর্মকর্তার সই জালিয়াতি করে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ পায় ভ্যাট ঢাকা পূর্ব কমিশনারেট। এরই প্রেক্ষিতে তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে দেখা যায়, মেঘনা ক্যাবলসের কাছ থেকে নিয়মিত ক্যাবলস পণ্য (ক্যাবল, কন্ডাক্টর, ওয়্যার ইত্যাদি) কেনে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)। এ কেনাকাটায় প্রতি চালানের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে মূসক বা ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পল্লী বিদ্যুতের কাছে পণ্য বিক্রির পর ৭ ধাপে ভ্যাট ফাঁকি দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ভ্যাট ফাঁকি দিতে ভ্যাট ঢাকা পূর্ব কমিশনারেটের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জের মোগড়াপাড়া সার্কেলের তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তার সই জাল এবং বিক্রয় তথ্যও গোপন করে মেঘনা ক্যাবলস।
সূত্র আরও জানায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মেঘনা ক্যাবলসের ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ তদন্তে ৫ সদস্যের যাচাই কমিটি গঠন করে ঢাকা পূর্ব ভ্যাট কমিশনারেট। কমিটির তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলে। যাচাই কমিটির সুপারিশে মেঘনা ক্যাবলসকে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধ ও জালিয়াতির ব্যাখ্যা দিতে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সব নথিপত্র সঠিক বলে দাবি করে। পরবর্তীতে মোগড়াপাড়া সার্কেলের তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা এ এস এম মনিরুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে লিখিত প্রতিবেদনে তিনিও ভ্যাট ফাঁকির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
ভ্যাট ফাঁকি যেভাবে উদ্ঘাটিত হয়
যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ নভেম্বর মেঘনা ক্যাবলসে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ইস্যু করা চিঠিতে পণ্যের বিক্রয়মূল্য ৮ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৪১৭ টাকা ধরা হয়। এ চালানে ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য মূসক বা ভ্যাটের পরিমাণ ১ কোটি ২৬ লাখ ২৭ হাজার ৯৬২ টাকা, যা ওই মাসের মধ্যেই দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) সমন্বয় করার কথা। কিন্তু মেঘনা ক্যাবলস নভেম্বর মাসে দাখিল করা কাগজপত্রে মোট বিক্রির পরিমাণ দেখায় ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৭ হাজার ১১৭ টাকা। এ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক দেখানো হয় ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৭ টাকা। অর্থাৎ নভেম্বর মাসে সরকারি খাতায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার ৩০০ টাকা বিক্রয় দেখায়নি প্রতিষ্ঠান। যাতে প্রযোজ্য ভ্যাট ৯৮ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৫ টাকা। একইভাবে ডিসেম্বর মাসের দাখিলপত্রে (মূসক-৯.১) বিক্রয়মূল্য দেখানো হয় ১ কোটি ১৭ লাখ ১৯ হাজার ১২১ টাকা। এ হিসাবে ১৫ শতাংশ হিসেবে মূসক দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৫৭ হাজার ৮৬৮ টাকা। দুই মাসে ভুল তথ্য দিয়ে আগের ১ কোটি ২৬ লাখ ২৭ হাজার ৯৬২ টাকার ভ্যাট সমন্বয় করেনি মেঘনা ক্যাবলস।
একইভাবে এর আগে ২০২৩ সালের ২, ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বরের ১০টি চালানে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতের ইস্যুকৃত বিক্রয়মূল্য ধরা হয় ৭ কোটি ৮৪ লাখ ৭৩ হাজার ২১৬ টাকা। এতে ১৫ শতাংশ হারে মূসক হয় ১ কোটি ১৭ লাখ ৭০ হাজার ৯৮২ টাকা। এ টাকা ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সমন্বয় করার কথা। কিন্তু মেঘনা ক্যাবলসের সেপ্টেম্বরের দাখিলপত্রে বিক্রয়মূল্য দেখানো হয় ৩ কোটি ৫০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৬ টাকা। যাতে মূসকের পরিমাণ দেখানো হয় ৫২ লাখ ৬১ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা বিক্রয় গোপন করা হয়েছে। এতে প্রযোজ্য ভ্যাট ৬৫ লাখ ৯ হাজার ৯৩২ টাকা। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একই পদ্ধতিতে আরও পাঁচবার মেঘনা ক্যাবলস ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে যাচাই কমিটি। মোগড়াপাড়া সার্কেলের ০৩/২০২৪/১১৩, ২০২৪/১৯৭, ২০২৪/১৬৩, ২০২৩/১৪২ ও ২০২৩/১১৯নং নথিতে যথাক্রমে ১ কোটি ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৭, ১ কোটি ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫৭৮, ১ কোটি ২১ লাখ ২৩ হাজার ১৪০, ৯৫ লাখ ১৫ হাজার ২০১ এবং ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৮ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে মেঘনা। সব মিলিয়ে এই পাঁচবারে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ৬ কোটি ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৫ টাকা।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর ফাঁকি স্বীকার করেছে মেঘনা ক্যাবলস
ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশে উপযুক্ত জবাব না পেয়ে মেঘনা স্টার ক্যাবলসের নামে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি এ মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। মামলার প্রতিবেদন, জারিকৃত কারণ দর্শানোর নোটিশ, নোটিশের জবাব এবং শুনানির বক্তব্য পর্যালোচনা করে মেঘনা ক্যাবলসের ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণ হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, মেঘনা ক্যাবলস মনোনীত প্রতিনিধি শুনানিতে ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি স্বীকার করে ইতোমধ্যে ২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন এবং অবশিষ্ট ভ্যাট ১২ কিস্তিতে পরিশোধের আবেদন দাখিল করায় ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মামলার রায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এর একাধিক বিধি লঙ্ঘনের দায়ে ফাঁকিকৃত ভ্যাটের সমপরিমাণ টাকা জরিমানাও করা হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা পূর্ব ভ্যাট কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক দিন ধরে মেঘনা ক্যাবলসের ফাইলটি প্রক্রিয়াধীন ছিল। তাদের প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরে মামলা হয়েছে। মামলার রায়ও হয়েছে। তাদের ফাইলটি সংশ্লিষ্ট সার্কেলে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে জালিয়াতি ও ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মেঘনা স্টার ক্যাবলস ও আল মোস্তফা গ্রুপের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মেঘনা ক্যাবলসের সেলিম নামের একজন জিএম অভিযোগের বিষয়ে বলেন, কাস্টমসের অফিসারদের সবার সঙ্গে তো সম্পর্ক ভালো থাকে না, তাই এ রকম অভিযোগ থাকেই। ভ্যাট ফাঁকির কোনো বিষয় নেই। আমাদেরকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল আমরা জবাব দিয়েছি। মামলার রায়ের বিষয়ে এখনও কিছু পাইনি।
