** সর্বশেষ দুই মামলায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট, ৩৬ কোটি টাকার মামলা প্রক্রিয়াধীন
** আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহ ঠিক থাকলেও অজুহাত দেখিয়ে প্রতিমাসে দাখিলপত্র ও রাজস্ব দিচ্ছে না
** প্রতিমাসে ৩-৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট রাজস্ব বকেয়া ১৩২ কোটি টাকা
** উচ্চ আদালতে বিচারাধীন ৭২ কোটি টাকার দুই মামলা নিষ্পত্তিতে এনবিআর ও এর্টনি জেনারেলের হস্তক্ষেপ চেয়ে কমিশনারেট থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে
জনপ্রিয় আইসক্রিম ব্র্যান্ড। উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। কিন্তু সঠিকভাবে রাজস্ব পরিশোধ করা হচ্ছে না। প্রতিমাসে অন্তত ৩-৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া জমা পড়ছে। শুধু রাজস্ব নয়, প্রতিষ্ঠানটি অজুহাত দেখিয়ে মাসিক রিটার্নও দেয় না। রাজস্ব আদায়ে প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দিলেও পরিশোধ করেনি। অবশেষে প্রতিষ্ঠান অভিযান করে সম্প্রতি দুইটি মামলা করা হয়েছে, যাতে রাজস্ব ফাঁকি প্রায় ২৫ কোটি টাকা। রাজস্ব ফাঁকি ও রিটার্ন দাখিলে অনিয়ম করা প্রতিষ্ঠানটি হলো পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসি। এছাড়া আরো ৩৬ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শুধু এই ২৫ কোটি টাকা নয়, জনপ্রিয় লাভেলো ব্র্যান্ডের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছে দুইটি মামলায় আরো প্রায় ৭২ কোটি রাজস্ব বকেয়া রয়েছে, যা উচ্চ আদালতে চলমান রয়েছে। এই নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে আইসক্রিম বিক্রিতে বকেয়া রাজস্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। বকেয়া রাজস্ব আদায়ে এই দুইটি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে সম্প্রতি এনবিআর ও এর্টনি জেনারেলকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট থেকে এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। তবে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
দুই মামলায় রাজস্ব ফাঁকি প্রায় ২৫ কোটি টাকা
এনবিআর সূত্রমতে, ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসি। আইসক্রিম তৈরি ও বাজারজাতকরণে ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। একইসঙ্গে প্রতিমাসে দাখিলপত্র (রিটার্ন) জমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ও রাজস্ব পরিশোধ করেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিমাসে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এরই প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১২ মে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেটের একটি দল প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে। এসময় কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির লাভেলো ব্র্যান্ডের ২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে-এই তিন কর মেয়াদের বিক্রি ও রাজস্ব সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন। সংগ্রহ করা দলিলাদি পর্যালোচনা করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি পাওয়া যায়। পরে কর্মকর্তারা একটি প্রতিবেদন দেয়। যাতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি লাভেলো ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিম উৎপাদন করে বাজারজাত করে। যাতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য। এছাড়া মূসক আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি একটি উৎসে মূসক কর্তনকারী সত্ত্বা। আইসক্রিম তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি ফুল ক্রিম মিল্ক পাউটার, স্কিম মিল্ক পাউডার, ভেজিটেবল ফ্যাট, সুগার, ফুড কালার, ফ্লেভার ব্যবহার করে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাভেলোর প্রতিমাসে দাখিলপত্র জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনমাসে কোন রিটার্ন দাখিল করেনি। এমনকি রাজস্ব ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়নি। এই তিনমাসে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৫৪ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার ৫৮৮ টাকা টাকার আইসক্রিম বিক্রি করে। যাতে ১০ শতাংশ হারে প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৮ টাকা। ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাট ৯ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ১২৭ টাকা। ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কসহ মোট রাজস্ব ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩৮৫ টাকা, যা প্রতিষ্ঠান পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। হিসাবমতে, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিমাসে গড়ে ১৮ কোটি টাকার আইসক্রিম বিক্রি করেছে, যাতে প্রতিমাসে গড়ে রাজস্ব আসে প্রায় পৌনে ৫ কোটি টাকা। এই রাজস্ব পরিশোধে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট থেকে ৩০ জুন দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
অপরদিকে, একই অভিযোগে ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটের কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালনা করে। পরে প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ও ভ্যাট সংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ করা হয়। যা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, লাভেলো ২০২৪ সালের জুলাই হতে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দাখিলপত্র ও রাজস্ব পরিশোধ করেনি। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ৭০ হাজার ৮০৪ টাকার আইসক্রিম বিক্রি করেছে। যাতে প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪৭ হাজার ৮১ টাকা ও প্রযোজ্য ভ্যাট ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৮২ হাজার ৬৮৩ টাকাসহ মোট রাজস্ব ১০ কোটি ৪৬ লাখ ২৯ হাজার ৭৬৪ টাকা। ফাঁকি দেওয়া এই রাজস্ব পরিশোধে ২০২৫ সালের ২৬ জুন ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেট থেকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এই কমিশনারেটের আওতায় চলে এসেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সংক্রান্ত সকল বিষয় এই কমিশনারেট থেকে হবে। সূত্র বলছে, এই মামলার দাবিনামা ও কারণ দর্শানোর বিষয়ে সম্প্রতি লাভেলো জবাব ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেটে দাখিল করেছে। যাতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের সঠিক হিসাব হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
১৩২ কোটি টাকা আদায়ে এনবিআর ও এটর্নি জেনারেলকে চিঠি
এনবিআর সূত্রমতে, বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেয়ার পরপরই সারাদেশে বকেয়া রাজস্ব আদায়ে জোর দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট লাভেলো থেকে ভ্যাট আদায়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয়। তবে উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে কজলিস্টে মামলা আনতে এনবিআর ও এটর্নি জেনারেলের হস্তক্ষেপ চেয়ে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেট থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, লাভেলোর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৩৩ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেট চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে। ২০২১ সালের জুলাই হতে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত এই রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। একইভাবে একই বছরের ৪ জুন ৩৮ কোটি ২৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৮৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করে। ২০২২ সালের আগস্ট হতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই ফাঁকি হয়েছে বলে অভিযোগ। রাজস্ব পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়। পরে দুইটি মামলা নিয়ে প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতে রিট করে। শুনানি শেষে ওই বছরের ২৭ আগস্ট অন্তবর্তী আদেশ জারি করে। যাতে ১০ শতাংশ জমা দিয়ে বিআইএন আনলক করার আদেশ দেয় আদালত। একইসঙ্গে পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে অবশিষ্ট ৯০ শতাংশ বিবিধ খাত (সানড্রাই একাউন্ট) জমা রাখার নির্দেশনা প্রদান করেন। তবে প্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে বিআইএন আনলক করে। কিন্তু ৯০ শতাংশ টাকা জমা না দিয়ে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল মামলা করে। আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের ১০ জুন স্থিতাবস্থা এবং চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি রিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্ট্যাটাস কোয়া কন্টিনিউ করে রিসপোজাল অব রুল এর আদেশ দেন। এই বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশনের শুনানি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন মর্মে আদেশে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন ও ব্যাংক হিসাব খোলা রাখার সিদ্ধানটি রিট মামলা নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে এবং মোট ৭২ কোটি ৬ লাখ টাকা আদায়ের কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৩০ মাস কোন দাখিলপত্র জমা দেয়নি এবং কোন রাজস্ব পরিশোধ করেনি। এই ৩০ মাসে প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় ১৩২ কোটি ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে, যা প্রতিমাসে গড়ে ৩-৪ কোটি টাকা করে বকেয়া রাজস্ব জমা পড়ছে। মামলা দুইটি কজলিস্টে অন্তভূক্ত করতে ইতোমধ্যে এটর্নি জেনারেলকে দুই বার চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর পরিশোধে আপত্তি নেই। তবে বকেয়া থাকায় অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া যাচ্ছে না-এমন অজুহাতে প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দাখিল করছে না। বকেয়া রাজস্ব আদায়ে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে এনবিআর ও এটর্নি জেনারেলের হস্তক্ষেপ চেয়েছে ভ্যাট কমিশনারেট।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত বুধবার তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইকরামুল হককে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াসঅ্যাপ নাম্বারে বক্তব্যের লিখে দেওয়া হলে তিনি রোববার অফিসে গিয়ে বিষয়টি চেক করবেন বলে জানান। শনিবার নক করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। সরদার মিজানুর রহমান দাবি করেন কোন রাজস্ব ফাঁকি হয়নি। তিনি বলেন, আমরা শুনানিতে গিয়েছি। এর মধ্যে প্রথম মামলার (১০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা) প্রায় ৪০ শতাংশ টাকা জমা দিয়েছি। বাকিটা সময় নিয়েছি। সময়ের মধ্যে দিয়ে দেবো। রিটার্ন না দেওয়ার বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, আগে রিটার্ন না দেওয়ার কারণে এই সমস্যা ছিলো। টাকা-পয়সার ক্রাইসিস ছিলো। বকেয়া থাকলে সেটা না দিয়ে রিটার্ন দাখিল করা যায় না। আমরা এখন আস্তে আস্তে দিয়ে আসতেছি। রাজস্ব ফাঁকি হয়নি।
** ঋণে জর্জরিত লাভেলোর শেয়ার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
** লাভেলোর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন
** সীমান্ত ব্যাংকের ১৩৫ কোটি পরিশোধ করে না লাভেলো
