বাড়বে বৈষম্য, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ

নতুন পে-স্কেল

নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে এমনিতেই চাপে রয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে কয়েক দফা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অনেক পরিবারের মাস চালানোর বাজেট এখন মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের কোটি কোটি মানুষের আয় বাড়াবে কে?

ভুক্তভোগীরা বলছেন, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিপরীতে সরকারি সুবিধার আওতায় থাকা বেসামরিক ও সামরিক চাকরিজীবীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ২৪ লাখ। ফলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর আয় না বাড়লেও তাদের বাড়তি দামে নিত্যপণ্য কিনতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাজার অর্থনীতিতে একজন ক্রেতা সরকারি না বেসরকারি চাকরি করেন, তার কোনো আলাদা পরিচয় নেই। বাজারে সবাই ক্রেতা এবং সবাইকে একই দামে পণ্য কিনতে হয়। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লেও বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় অপরিবর্তিত থাকলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন জাতীয় পে-স্কেলের প্রভাব শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব বাজারেও পড়তে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ার ফলে বাজারে চাহিদা বাড়লে নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। দেশের সাড়ে ১৪ লাখের বেশি বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়লে শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও তারল্য সংকটসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকা উচিত।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সুখবরের মধ্যেই বাজারে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। মঙ্গলবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি সরু চাল কিনতে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা গুনতে হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ টাকায়, যা এক মাস আগেও ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। এক ডজন ডিম কিনতে লাগছে ১৫০ টাকা, এক মাসের ব্যবধানে যা বেড়েছে ৩০ টাকা। নতুন করে চিনির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। ভোজ্যতেলের দামও লিটারপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা। চড়া রয়েছে সবজির দামও। ফলে মাছ-মাংসসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকালে মালিবাগ কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মাসে ৩৬ হাজার টাকা বেতন দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তার ভাষায়, কোনোমতে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। সবকিছু অল্প পরিমাণে কিনতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন। অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে। বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহণ, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার খরচও বেড়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তার বেতন বাড়েনি। কাওরান বাজারে পণ্য কিনতে আসা মো. নোমানও একই ধরনের হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, মাস শেষে ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। গত ছয় বছরে তার আয় এক টাকাও বাড়েনি। অথচ এ সময়ে বাজারের সব ধরনের পণ্য, বাসাভাড়াসহ অন্যান্য খরচ বেড়েছে। তিনি বলেন, ব্যয়ের বাজেট ঠিক রাখতে গিয়ে আর কত কাটছাঁট করবেন? খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি তার সন্তানরাও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে সরকার তাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে, কিন্তু তাদের মতো মানুষের কী হবে—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষই ভুগছেন। সরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়া হলে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। কিন্তু দেশের বাকি জনগোষ্ঠীর জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেই প্রশ্নেরও সমাধান প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাজারে সবাইকেই যেতে হয়। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দেশের সব মানুষের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পণ্যের দাম কমানোর পাশাপাশি টিসিবির মাধ্যমে আরও বেশি পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলা হলেও বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নেই। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ভোগান্তিতে ফেলছেন। অথচ বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরাও অনেক সময় রহস্যজনক কারণে নীরব থাকেন।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ায় প্রায় ১৪ লাখ বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সুবিধা পাবেন। তারা নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু অন্যদের জন্য কোনো সুখবর নেই। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে বের করে আনতে হলে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ালেই হবে না; বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয় বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শেষ মাস জুলাইয়ে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুনে এ হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার বড় কোনো স্বস্তি আসেনি। কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের তুলনায় এখনো বেশি। সীমিত আয়ের মানুষকে তাই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতিনিয়ত নিজেদের বাজেট কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়বে। জানা গেছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে। আর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার কথা রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে তাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় যদি একই জায়গায় থাকে, তাহলে বাজারের বাড়তি চাপ তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই নতুন পে-স্কেলের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।