বাঘ বা হাতি শিকারের মতো অপরাধ দ্বিতীয়বার সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রেখে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বুধবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়–এর লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
নতুন আইনের ৪১ (১) ধারা অনুযায়ী, বাঘ (বেঙ্গল টাইগার) বা হাতি (এশিয়ান এলিফ্যান্ট) শিকার করলে সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে দোষী ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া ৪১ (২) ধারায় বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া বাঘ বা হাতির ট্রফি, মাংস কিংবা দেহাংশ সংগ্রহ, পরিবহন বা কেনাবেচা করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে।
নতুন আইনে ভালুক, নেকড়ে, রাম কুকুর, খেকশিয়াল, বনবিড়াল, চিতা, চিতাবাঘ, চিতাবিড়াল, ভোঁদড়, বানর, হনুমান, বনরুই, সজারু, খরগোশ, হরিণ, শকুন, তিমি, ঈগল, হাড়গিলা, টিয়া, কুমির, কাছিম, কচ্ছপ, গিরগিটি, তক্ষক, অজগর ও হাঙ্গর শিকার করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রক্ষিত এলাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। অভয়ারণ্যের ভেতরে চাষাবাদ, খনিজ সম্পদ আহরণ, আগুন লাগানো এবং আগ্রাসী বিদেশি উদ্ভিদ প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার ও জীবিকার প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আইনে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বৃক্ষ, ঐতিহ্যবাহী স্মারক বৃক্ষ, পবিত্র বৃক্ষ এবং প্রথাগত ‘কুঞ্জবন’ সংরক্ষণের ধারা যুক্ত করা হয়েছে। জীবন রক্ষার প্রয়োজন ছাড়া কেউ এসব বৃক্ষ বা বন ধ্বংস করতে পারবেন না। এই বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে বলা হয়েছে, সোশাল মিডিয়ায় বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বিজ্ঞাপন দেওয়া বা বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ভিডিও প্রকাশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী বা ট্রফি (চামড়া, হাড়, দাঁত ইত্যাদি) নিজের দখলে রাখা বা কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, বন্যপ্রাণীর উদ্ধার, শুশ্রুষা এবং সংরক্ষণের জন্য সরকার ‘বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করবে। এছাড়া বন্যপ্রাণী পাচার রোধে বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে পুলিশ, কাস্টমস ও বিজিবির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট’ কাজ করবে। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে একটি ‘বৈজ্ঞানিক কমিটি’ গঠন করা হবে, যা আন্তর্জাতিক সাইটিস কর্তৃপক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে।
অধ্যাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে প্রথাগত ঐতিহ্য হিসেবে তাদের সংগৃহীত বন্যপ্রাণীর ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্নের ক্ষেত্রে জব্দকরণের বিধান প্রযোজ্য হবে না। নতুন আইনে বন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জব্দ করা দ্রুত পচনশীল দ্রব্য তাৎক্ষণিক ধ্বংস বা অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ পাবেন।

