বাংলাদেশে উৎসব-পার্বণসহ বিপুল চাহিদার কারণে মসলার বাজার বড় হলেও দেশীয় উৎপাদন সীমিত থাকায় এটি প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে, যার সিংহভাগ এখন ভারতের দখলে। চলতি শতকের শুরুতে ভারত থেকে মসলা আমদানি সীমিত থাকলেও ২০১০ সালের পর প্যাকেটজাত খাদ্য ও রেস্তোরাঁ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং স্থল বাণিজ্য সহজ হওয়ায় আমদানি দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে গত দেড় দশকে ভারত থেকে মসলার সরবরাহ বেড়ে মোট আমদানির ৭৬ দশমিক ৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে প্রায় শতভাগ জিরা এবং এলাচ ও দারুচিনির বড় অংশই ভারত থেকে আসে। অথচ ২০১০ সালের আগে মূলত কাঁচামরিচ, হলুদ ও ধনিয়াই আমদানি হতো। তবে সাম্প্রতিক ডলার সংকট ও এলসি খোলায় কড়াকড়ির কারণে আমদানির গতি কিছুটা কমেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৬৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা মূল্যের ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৩৯ কেজি মসলা। এর মধ্যে ২ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার কেজি অর্থাৎ ৫৮ শতাংশের বেশি মসলা ভারত থেকে এসেছে। এর মধ্যে জিরার প্রায় পুরোটা অর্থাৎ ৯৯ দশমিক ৭৯ শতাংশের উৎস প্রতিবেশী দেশ। ভারত থেকে জিরা এসেছে ১ কোটি ৯১ লাখ ১৯ হাজার ২৩৪ কেজি। সামান্য পরিমাণ আফগানিস্তান, তুরস্ক বা আরব আমিরাত থেকে এসেছে।
গত অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ কোটি ৯৭ লাখ ২৯ হাজার ১৬১ কেজি মসলা আমদানি হয়, যার মধ্যে ভারত থেকে আসে ৩ কোটি ৫ লাখ ৩৯ হাজার ১১০ কেজি, অর্থাৎ মোট আমদানির ৭৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মূলত চারটি প্রধান মসলা—জিরা, এলাচ, দারুচিনি ও ধনিয়া—সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়, যেখানে জিরার আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে ৭৭১ কোটি ৪৬ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৬ টাকা মূল্যের ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫৮ হাজার ২৫০ কেজি জিরা আমদানি হয়, যার ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশই ভারত থেকে আসে; বাকি অংশ আসে আফগানিস্তান, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এছাড়া ১৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৮ টাকা মূল্যের ২৪ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ কেজি এলাচ, ৮৮ কোটি ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৯ টাকা মূল্যের ২১ লাখ ৮৩ হাজার ২২০ কেজি দারুচিনি এবং ১ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬৬ টাকা মূল্যের ১ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ কেজি ধনিয়া আমদানি করা হয়।
ভারতের সরকারি সংস্থা স্পাইস বোর্ড অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতীয় মসলা রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৪ হাজার ৮৭২ টন। এর মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩০ কোটি ভারতীয় রুপি। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ রপ্তানি। এর আগের অর্থবছরগুলোতে ভারত থেকে যথাক্রমে ২ হাজার ৮৬৬ কোটি রুপি, ২ হাজার ০৭৬ কোটি রুপি, ১ হাজার ৭৪৩ কোটি রুপি, ২ হাজার ৩৩৩ কোটি রুপি ও ১ হাজার ৯৬২ কোটি রুপির মসলা বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে ভারত।
ভারতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপট
বাংলাদেশে মসলা সরবরাহকারী শীর্ষ পাঁচটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিই ভারতীয়। শীর্ষে থাকা মাভিহা ওভারসিজ চলতি অর্থবছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ দশমিক ৫০ লাখ কেজি মসলা বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে শুধু জিরাই ২১ লাখ ১৮ হাজার ৫২০ কেজি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এমটিই এক্সিম প্রাইভেট লিমিটেড ২৭ দশমিক ৬৯ লাখ কেজি মসলা রপ্তানি করেছে, এর মধ্যে জিরা ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৬৪০ কেজি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বিনয়কুমার অ্যান্ড কোং ২০ দশমিক ৮২ লাখ কেজি মসলা রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ১৫ দশমিক ৪৫ লাখ কেজি জিরা। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ভারতের শ্রীপালি ১৬ দশমিক ৮৩ লাখ কেজি মসলা রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে জিরা ৯ দশমিক ৯০ লাখ কেজি। শীর্ষ পাঁচের তালিকায় ভারতের বাইরে একমাত্র প্রতিষ্ঠান ভিয়েতনামের প্রোসি থাং লং জয়েন্ট স্টক কোং, যা দারুচিনির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ২০ দশমিক ৫ লাখ কেজি মসলা রপ্তানি করেছে।
ভারতের বাইরে দ্বিতীয় শীর্ষ উৎস দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম থেকে চলতি বছরে প্রায় ৭৮ লাখ ৪ হাজার কেজি মসলা আমদানি করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই দারুচিনি ও গোলমরিচ। এছাড়া ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত চীন থেকে প্রায় ২৫ লাখ ৭৯ হাজার কেজি, ইতালি থেকে প্রায় ১৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি এবং ভুটান থেকে প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার কেজি মসলা আমদানি হয়েছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কার থেকে মূলত লবঙ্গ আমদানি করা হয়। ভারতের মসলা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, করোনা-পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে মসলা রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়, বিশেষ করে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার টন মসলা রপ্তানি হয়, যার মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৩৩ কোটি রুপি। পরবর্তী দুই বছরে ডলার সংকট ও এলসি খোলার সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও মূল্য তেমন কমেনি, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে মসলার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের রপ্তানি আয় বেড়ে যায়।
ভারতে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকা
এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মসলা আমদানির বিপরীতে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ভারতে যাচ্ছে। চলতি বছরে ভারত থেকে মোট ২ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার কেজি মসলা আমদানি হয়, যার শুল্কমূল্য প্রায় ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জিরা আমদানিতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। ভারত থেকে আমদানিকৃত ১ কোটি ৯১ লাখ ১৯ হাজার ২৩৩ কেজি জিরার বিপরীতে মোট মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ৮০৯ কোটি ৮২ লাখ ৭৫ হাজার ৭৮৩ টাকা। অন্যদিকে জিরা বাদে ভারত থেকে এলাচ, ধনিয়া, দারুচিনিসহ অন্যান্য মসলা আমদানি হয়েছে ২৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭৬৬ কেজি, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৪১৩ কোটি ১৭ লাখ ২৪ হাজার ২১৬ টাকা।
দেশীয় বাজারে প্রতিযোগিতার চিত্র
দেশের বাজারে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মধ্যে করপোরেট জায়ান্ট এবং মৌলভীবাজার ও খাতুনগঞ্জের বড় পাইকারদের আধিপত্য দেখা গেছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চতুর্থ অবস্থানে থাকা মেসার্স এম আর স্টোর এবার ২৫ লাখ ৩ হাজার কেজি মসলা আমদানি করে শীর্ষস্থান দখল করেছে। এর মধ্যে এক লাখ কেজি ছাড়া পুরোটাই জিরা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্কয়ার ফুড ব্র্যান্ডেড পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে জিরা, দারুচিনি ও এলাচ মিলে ১৯ লাখ ৭১ হাজার কেজি মসলা আমদানি করেছে। গত বছর তাদের আমদানি ছিল ২১ দশমিক ২৭ লাখ কেজি।
গত বছর শীর্ষ আমদানিকারক মেসার্স এম এস এন্টারপ্রাইজ এবার তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানির পরিমাণ ২৩ লাখ ৫ হাজার কেজি থেকে কমে ১৭ লাখ ৯০ হাজার কেজিতে দাঁড়িয়েছে। তালিকায় ১০ লাখ ৪০ হাজার কেজি আমদানি করে মেসার্স ভাই ভাই স্টোর চতুর্থ, ৭ লাখ ৭৭ হাজার কেজি নিয়ে পি কে এন্টারপ্রাইজ পঞ্চম, ৭ লাখ ৬৫ হাজার কেজি নিয়ে প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেড ষষ্ঠ, ৭ লাখ ৫০ হাজার কেজি নিয়ে সাঈদ ট্রেডার্স সপ্তম এবং ৭ দশমিক ৪৮ লাখ কেজি আমদানি করে বশির ট্রেডার্স অষ্টম স্থানে রয়েছে। এর বাইরে শীর্ষ ১০ আমদানিকারকের মধ্যে ৬ লাখ ৩৯ হাজার কেজি নিয়ে রাজ এন্টারপ্রাইজ নবম এবং ৬ লাখ কেজি মসলা আমদানি করে শারিম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড দশম স্থানে রয়েছে। তবে একক কোনো দেশের ওপর অতিনির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে জিরার ফলন বিপর্যয়, শুল্কনীতি পরিবর্তন বা মূল্য অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের খুচরা বাজারে পড়ে, যা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাই বিকল্প ও সাশ্রয়ী আন্তর্জাতিক উৎস বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কখনই ইতিবাচক নয়। এতে সবসময় ঝুঁকি থেকে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, কূটনৈতিক টানাপড়েন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে আমদানিনির্ভর বাজার বড় সংকটে পড়তে পারে। তাই সরকার ও ব্যবসায়ী— উভয় পক্ষকেই বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার বিষয়ে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নতুন উৎস দেশ থেকে আমদানি বাড়াতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের জন্য ট্যারিফ ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।’
