বছরে ৩ মিটার করে নামছে ঢাকার ভূগর্ভস্থের পানি

রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং যে হারে কমছে, তা আর পুনরায় পূরণ হচ্ছে না। এলাকাভেদে পানির স্তরে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সামগ্রিক চিত্র উদ্বেগজনক। ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে পানির স্তর ছিল ৩৯ দশমিক ৬ মিটার, যা ২০২৪ সালে নেমে গিয়ে ১০৯ মিটারে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৩ মিটার করে পানির স্তর কমছে। গত দুই দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০২ সালে এটি ছিল ৪৫ দশমিক ৬ মিটার, ২০০৩ সালে ৪৮ মিটার, ২০০৪ সালে ৫১ মিটার, ২০০৫ সালে ৫৪ দশমিক ২ মিটার, ২০০৬ সালে ৫৭ মিটার এবং ২০০৭ সালে ৬০ মিটার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও একই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে—২০২০ সালে ৯৯ মিটার, ২০২১ সালে ১০২ দশমিক ৮০ মিটার, ২০২২ সালে ১০৪ দশমিক ৮০ মিটার, ২০২৩ সালে ১০৬ দশমিক ৮ মিটার এবং ২০২৪ সালে ১০৬ মিটার। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০২৬ সালে পানির স্তর ১১৫ মিটার বা তারও বেশি নিচে নেমে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।

বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করছে, আর অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ আসছে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এই চিত্র বদলে দিতে নতুন সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। রাজধানীর পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির আওতা ৪০১ বর্গকিলোমিটার এবং আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে সংযোগ রয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার। প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার হলেও কর্তৃপক্ষ উৎপাদনক্ষমতা ৩২০ কোটি লিটার বলে দাবি করে। তবুও প্রতি শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর এলাকায় সরবরাহ বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ৫টি পানি শোধনাগার থেকে প্রায় ৯০ কোটি লিটার এবং ১ হাজার ৩২৮টি গভীর নলকূপ থেকে প্রায় ২২০ কোটি লিটার পানি সংগ্রহ করছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া পরিবেশের জন্য নেতিবাচক ঘটনা। এখান থেকে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে, তবে এটা গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। বিশেষজ্ঞরা আমাকে এ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, নতুন সরকার ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী ভূ-উপরিস্থিত উৎসের পানির উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভূউপরিস্থিত উৎস থেকে পানির উৎপাদন ৮০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে ঢাকা ওয়াসা। সে লক্ষ্যে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-৩, পদ্মা পানি শোধনাগার ফেজ-২ চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে। গন্ধবপুর পানি শোধনাগারের পানি দ্রুত ঢাকায় আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, এযাবৎকাল যেসব গবেষণা হয়েছে, সেসবের কোথাও ঢাকায় ভূমিধসের কথা উঠে আসেনি। তবে ঢাকার মাটির গঠন দুই ধরনের-কোথাও শক্ত এবং কোথাও নরম মাটি। দুর্বল মাটিতে ভূমিধস হতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তিনি জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার বিষয়টি নেতিবাচক। পৃথিবীর যেসব শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, সেসব শহর তা পূরণ করার কাজ শুরু করেছে। জাকার্তা ও মেক্সিকো সিটিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা হয়নি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মেক্সিকো সিটি, ইতালির মিলান, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এবং জাপানের উদাহরণ সামনে আসে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত মেক্সিকো সিটি নিজস্ব উচ্চতা থেকে প্রায় ২০ ফুট ধসে গেছে, যার ফলে শহরটির বাহ্যিক গঠনও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়ে এবড়োখেবড়ো হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে পানির সংকট বাড়ে, পানি উত্তোলনের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য বসবাসে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তিনি আরও জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পানির স্তর কমে যাওয়ার কারণে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে; তাই ঢাকার ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা জরুরি ভিত্তিতে গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন।