বছরে ১.৮৮ লাখ কোটি টাকা হারিয়েছে এনবিআর

অব্যাহতি ও ভ্যাট ফাঁকি

দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় যে পরিমাণ অব্যাহতির সুযোগ রয়েছে এবং যে পরিমাণ কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে, তাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ‘হারিয়েছে’ বলে ধারণা মিলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক গবেষণায়। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে বেসরকারি এ গবেষণা সংস্থা।

গবেষণায় বলা হয়, ৭২ শতাংশ কোম্পানি মনে করে, করপোরেট করের ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তাদের জন্য ‘অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ’। ৮২ শতাংশ মনে করে, তাদের ওপর ‘অন্যায্য’ হারে কর বসানো হয়েছে। এছাড়াও ৭৯ শতাংশ কোম্পানি এনবিআর কর্মকর্তাদের ‘জবাবদিহিতার অভাবকে’ তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখিয়েছে। ৭২ শতাংশ কোম্পানি মনে করে, করপোরেট করের ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ৮২ শতাংশ মনে করে, তাদের ওপর অন্যায্য হারে কর বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ৭৯ শতাংশ কোম্পানি এনবিআর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাবকে তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখিয়েছে।

সিপিডির জ্যৈষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামীম আহমেদ বলেন, আমরা যেটা করেছি, ইফেক্টিভ রেট (ভ্যাটের কার্যকর হার) বের করেছি, যেটা আসছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।সেটি দিয়ে আমরা দেখেছি, আমাদের একচুয়াল ভ্যাট আদায় কত আসা উচিত। মানে ভ্যাট আদায় যত হয়েছে সেটা বাদ দেওয়ার পরেও সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার মত আসছে।

তামীম আরও বলেন, এনবিআরে ডাটা আনতে গেলে দুঃখজনকভাবে আমার কাছেও ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। এনবিআরে তথ্য চেয়ে বিড়ম্বনার মুখে পড়ার অভিযোগ করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও। তিনি বলেছেন, আমরাও চেয়েছিলাম ২৫ সালের ডাটা নিয়ে গবেষণা করতে। কিন্তু আনফরচুনেটলি এনবিআরে তথ্য চেয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। তবে কোন ধরনের বিড়ম্বনার মুখে পড়েছিলেন, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআর আদায় করেছে ১ লাখ ৩২ হাজার ০৩৬ কোটি টাকা। তবে সে সময়ে ভ্যাট বাবদে ৩ লাখ ২০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে আসার ‘সম্ভাবনা’ ছিল। বাকি অর্থ কর ফাঁকি ও অব্যাহতির জন্য এনবিআর ‘হারিয়েছে’ বলে গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে।

দেশের ভ্যাট আইন অনুযায়ী স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ করা হলেও বর্তমানে অনেক পণ্য ও সেবায় অব্যাহতি রয়েছে। সেসব হিসাব করে সিপিডি দেখিয়েছে, বর্তমানে ভ্যাটের কার্যকর গড় হার হল ১১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ গবেষণার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১২৩টি কোম্পানির কাছ থেকে করপোরেট কর এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার ৩৮৯টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাটের তথ্য সংগ্রহে করেছে সিপিডি।
NBR CM 6
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের অডিট রিপোর্টের কোয়ালিটি নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। অডিটের ঘোষণাগুলো দেখলে বোঝা যায় এখানে প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনি। বর্তমানে এনবিআরে অডিটের ম্যানুয়াল সিলেকশন বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ, অডিট ম্যানুয়াল সিলেকশন হলে একই ব্যক্তি প্রতি বছর অডিটের আওতায় পড়ে যান। আমরা বলেছি অডিট সিলেকশন হবে ঝুঁকিকে ভিত্তি করে। এ কারণে আমরা যতদিন পর্যন্ত ডিজিটাল সিস্টেম করতে না পারব, ততদিন ম্যানুয়াল ভ্যাট অডিট বন্ধ থাকবে। দরকার হলে কেয়ামত পর্যন্ত অডিট বন্ধ থাকবে। আমাদের অটোমেটেড করতেই হবে।

ন্যূনতম করকে কালাকানুন উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কোনো সন্দেহ নেই ন্যূনতম কর একটা কালাকানুন। এটা স্বীকার করতেই হবে। বিজনেসে কর হবে মুনাফার ওপর। তা না করে মিনিমাম কর নির্ধারণ করছি। সমস্যা হচ্ছে এগুলো ঠিক করতে গেলে আমাদের কর আহরণ কমে যাবে। আমরা যে পরিমাণ ঋণ করেছি, আমাদের পরের প্রজন্মের ওপর যে পরিমাণ চাপিয়ে দিচ্ছি; যদি আমরা যথেষ্ট পরিমাণ কর আদায় করতে না পারি, তাহলে বিপদ আছে। কর জিডিপি অনুপাত ক্রমান্বয়ে কমছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটা খুবই আশঙ্কাজনক। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার দলের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, পাকিস্তানের কর জিডিপি অনুপাত ১২.২। আর আমাদের গত বছর ছিল ৭.৪। এ বছর আরও কমেছে। ৬.৬ হয়ে গেছে। এটা দিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ ও দেশের উন্নয়ন করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের।

** ‘প্রয়োজনে কেয়ামত পর্যন্ত ভ্যাট নিরীক্ষা বন্ধ থাকবে’
** ন্যূনতম কর একটি কালাকানুন: এনবিআর চেয়ারম্যান
** ৭২ % ব্যবসায়ী মনে করেন কর কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত