আত্মহত্যা দেশে ক্রমেই বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ৭৬ হাজার ৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ, বছরে গড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। এই সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২১ সালের অনুমিত হিসাবের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। পারিবারিক ও সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, বেকারত্ব, পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপসহ নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণে এ ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কীটনাশকের মতো প্রাণঘাতী উপকরণের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
গতকাল রোববার রাজধানীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) আয়োজিত আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক এক সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আত্মহত্যা প্রতিরোধ প্রকল্প ‘লাইভ লাইফ: সুইসাইড প্রিভেনশন ইন বাংলাদেশ’-এর আওতায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ডব্লিউএইচও এবং আইসিডিডিআরবি যৌথভাবে সভাটির আয়োজন করে। এতে মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, গবেষক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধান বাতিল বা সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। বক্তারা বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তি সাধারণত গভীর মানসিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান। তাই তাঁদের শাস্তির পরিবর্তে প্রয়োজন চিকিৎসা, সহায়তা ও সহানুভূতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ ২০২১ সালের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ৪ হাজার ৭১৪ জন আত্মহত্যা করেন। তবে পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ১৪ থেকে ১৫ হাজার।
অনুষ্ঠানের প্রথম উপস্থাপনায় আইসিডিডিআরবির মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি প্রজেক্ট কো–অর্ডিনেটর মোহাম্মদ সোহেল শমীক সমস্যার ব্যাপকতা তুলে ধরে বলেন, আত্মহত্যা বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমিত সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের নথিভুক্ত ঘটনা অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ (২০২১ সাল) অনুমিত হিসাবে দেশে বছরে ৪ হাজার ৭১৪ জন আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে পুলিশের রেকর্ড বলছে, বছরে ১৪ থেকে ১৫ হাজার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০ (খসড়া) অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া হয়। এতে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, আত্মহত্যা সবচেয়ে কম ২০২৪ সালে, ১৩ হাজার ৯৭৫টি। সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২২ সালে, ১৬ হাজার ৮৮৬টি। আর ২০২১ সালে ছিল ১৫ হাজার ৭৭৪টি, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া সংখ্যার চেয়ে তিন গুণের বেশি। আত্মহত্যার এসব ঘটনা সংশ্লিষ্ট থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয় এবং মামলা হয়।
দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সর্বোচ্চ সাজা এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। আত্মহত্যায় মৃত্যু হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারা অনুযায়ী, পুলিশ অপমৃত্যুর তদন্ত করে। আর কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তার প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার ঘটনা বেশি যশোর জেলায়। এ জেলায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৫৪টি। যশোরের পর অন্য যে ৯টি জেলায় আত্মহত্যা বেশি হয় সেই তালিকায় আছে ঢাকা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, পাবনা, ঝিনাইদহ ও নওগাঁ। মোহাম্মদ সোহেল শমীকসহ অনুষ্ঠানের একাধিক অংশগ্রহণকারী বলেন, আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার সব ঘটনা প্রকাশ পায় না, নথিভুক্তও হয় না। আবার হত্যাকে আত্মহত্যা বলার নজিরও আছে।
দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সর্বোচ্চ সাজা এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। আত্মহত্যায় মৃত্যু হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারা অনুযায়ী, পুলিশ অপমৃত্যুর তদন্ত করে। আর কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তার প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় উপস্থাপক আইসিডিডিআরবির মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী আনীকা তাসনিম হোসেন বলেন, আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা কম প্রকাশ পাওয়ার কারণ ভয় বা স্টিগমা। তিনি বলেন, ‘আত্মহত্যা বললে আইনি ঝামেলা পোহাতে হয়। তাই কেউ পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলে বলা হয় পানিতে ডুবে মরা গেছে।’ আনীকা তাসনিম হোসেন বলেন, আত্মহত্যা ও আত্মহত্যাচেষ্টার তথ্যের জন্য তিনটি উৎসের ওপর নির্ভর করা যেতে পারে। এগুলো হলো হাসপাতাল ও ক্লিনিক, থানা এবং কমিউনিটি। তিনি বলেন, কমিউনিটির মানুষই এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানেন। এলাকার শিক্ষক, ইমাম, গ্রাম পুলিশ, ওষুধের দোকানি, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা—তাঁরা তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারেন। এই তিনটি উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের সমন্বয় করলে সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে।
আইসিডিডিআরবির এই বিজ্ঞানী জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকল্পের আওতায় দেশের চারটি উপজেলায় এ বিষয়ে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। উপজেলাগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা, যশোরের অভয়নগর উপজেলা এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা। অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঝুঁকি বাড়ায়। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে অপরাধ বিবেচনা করা ঠিক নয়। আত্মহত্যার চেষ্টা করে যাঁরা ব্যর্থ হন তাঁদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি না নিয়ে চিকিৎসা করা উচিত, তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম বলেন, ‘আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বাদ যদি না–ও দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে আইন সংস্কার করতে হবে।’ আত্মহত্যাকারীর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। অনুষ্ঠানে বলা হয়, আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনে শাস্তির বিধান আছে। এই আইন করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটেনে আইনটি বাতিল হয়েছে, কিন্তু এ দেশে রয়ে গেছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আইনটি নেই।
অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঝুঁকি বাড়ায়। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে অপরাধ বিবেচনা করা ঠিক নয়। আত্মহত্যার চেষ্টা করে যাঁরা ব্যর্থ হন তাঁদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি না নিয়ে চিকিৎসা করা উচিত, তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৭১টি দেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ বিবেচনা করলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। অপরাধ বিবেচনা থেকে সরে আসায় শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরে আত্মহত্যা কমেছে।
শাস্তির বিধান কিছুটা রাখার পক্ষে মত দেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের দুজন চিকিৎসক। তাঁরা বলেন, ব্ল্যাকমেল করার জন্য বা কাউকে চাপে ফেলার জন্য আত্মহত্যার হুমকির বিষয়গুলো খেয়াল রাখা দরকার। পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ক্রাইম মেট্রো) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, আইনটি থাকার কারণে অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বিরত থাকেন। তিনি দাবি করেন, সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কম হওয়ার একটি কারণ এই আইনের উপস্থিতি। সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীরা জানেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করলে এক বছরের জেল হবে, এতে তাঁর চাকরিজীবনের বড় ক্ষতি হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৭১টি দেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ বিবেচনা করলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। অপরাধ বিবেচনা থেকে সরে আসায় শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরে আত্মহত্যা কমেছে। অনুষ্ঠানে বলা হয়, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়ায় কিছু কীটনাশক ও আগাছানাশক নিষিদ্ধ করে আত্মহত্যা কমানো সম্ভব হয়েছে।
দেশে আত্মহত্যার একটি বড় মাধ্যম কীটনাশক, বালাইনাশক বা আগাছানাশক। এর অধিকাংশ ব্যবহার করা হয় কৃষিকাজে। কিন্তু এর ব্যবহারে বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, নজরদারি নেই। এসব সহজে কিনতে পাওয়া যায়। জমিতে ব্যবহারের পর মানুষ তা অরক্ষিত অবস্থায় রেখে দেয়, যা মানসিক চাপে থাকা মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অনুষ্ঠানে বলা হয়, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়ায় কিছু কীটনাশক ও আগাছানাশক নিষিদ্ধ করে আত্মহত্যা কমানো সম্ভব হয়েছে। আইসিডিডিআরবির মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি প্রজেক্ট কো–অর্ডিনেটর মোহাম্মদ সোহেল শমীক বলেন, ভারতের কিছু অঞ্চলে কৃষক সরাসরি কীটনাশক হাতে পান না। সমবায়ের ভিত্তিতে কীটনাশক সংগ্রহ ও ব্যবহার হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকে কীটনাশক ব্যবহারের ওপর। এতে কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যা কমেছে।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন আইসিডিডিআরবির মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর মো. আনিসুর রহমান। এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার হাসিনা মমতাজ বলেন, তরুণ–তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। তাঁদের ঝুঁকিটা বুঝতে হবে। এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। সমাপনী বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাফিউন নাহার বলেন, নীতি সংস্কার প্রয়োজন, কাজটি কঠিন; কিন্তু কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ করা তো সম্ভব। দেখতে হবে সবার হাতে যেন কীটনাশক না পৌঁছায়।
