ফুরিয়ে আসছে দেশের গ্যাসের মজুদ

দেশের গ্যাসের মজুদ দ্রুত কমে আসছে। ইতোমধ্যে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উত্তোলনযোগ্য মজুদের প্রায় ৭৪ শতাংশই উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান হারে গ্যাস উত্তোলন অব্যাহত থাকলে অবশিষ্ট মজুদ দিয়ে আরও ১০ থেকে ১১ বছর চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। তবে মজুদ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসক্ষেত্রগুলোর চাপও কমবে, ফলে ধীরে ধীরে উৎপাদন হ্রাস পাবে। এর ধারাবাহিকতায় ২০৩১ সালের পর বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে।

জ্বালানি বিভাগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন পরিস্থিতির এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন (২৭০ কোটি) ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও ২০২৫ সালে তা কমে ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন (১৮০ কোটি) ঘনফুটে নেমেছে। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর চাপ ক্রমাগত কমতে থাকায় আগামী বছরগুলোতে উৎপাদনের পরিমাণ আরও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষার ভিত্তিতে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ২৯ হাজার ৯২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৯১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে, যা মোট মজুদের প্রায় ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।

অবশিষ্ট গ্যাসের মধ্যে তিতাস, রশিদপুর ও কৈলাসটিলার ক্ষেত্র ৩টিতে মজুদ রয়েছে ৬ হাজার ৩৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট বা ৮১ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্য ক্ষেত্রগুলোয় গ্যাসের মজুদ শেষ অথবা শেষের পথে রয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ, শ্রীকাইল ও বেগমগঞ্জ ক্ষেত্রে গ্যাস মজুদ প্রায় শেষ। আর বিবিয়ানা ও জালালাবাদে মজুদ কাগজে-কলমে শেষ। যদিও এ দুটি ক্ষেত্র থেকে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে যে কোনো সময় এ ক্ষেত্র দুটি থেকে গ্যাস পাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দুটি ক্ষেত্রই যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শেভরন পরিচালনা করছে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গ্যাস মজুদ রয়েছে রশিদপুর ক্ষেত্রটিতে যার পরিমাণ ২ হাজার ৩৮২ বিলিয়ন ঘনফুট। এর পরেই রয়েছে কৈশাসটিলা ক্ষেত্রটিতে- যেটায় গ্যাস মজুদের পরিমাণ ২ হাজার ৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট। এ দুটি ক্ষেত্র সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড পরিচালনা করছে। এছাড়া তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রটিতে মজুদ রয়েছে ১ হাজার ৯২৮ বিলিয়ন ঘনফুট। অন্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে বাখরাবাদ, ছাতক, সেমুতাং ক্ষেত্র তিনটিতে গ্যাস মজুদ রয়েছে যথাক্রমে ৪৮৯, ৪৪৮ ও ৩০৩ বিলিয়ন ঘনফুট। বাকিগুলোর মজুদ আরও কম। কিছু ক্ষেত্রে মজুদ এত কম যা কয়েক বছর পর উত্তোলনযোগ্য থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে স্থানীয় গ্যাস সরবরাহের অর্ধেকেরও বেশি আসছে শেভরনের ক্ষেত্রগুলো থেকে। তবে কয়েক বছর ধরে এগুলো থেকে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের কারণে তাদের মজুদ ফুরিয়ে এসেছে। যদিও দেশে গ্যাস মজুদের অর্ধেকেরও বেশি আছে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনাধীন গ্যাসক্ষেত্রে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলো সরবরাহ সেভাবে বাড়াতে পারেনি। দেশে গ্যাসের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে তাতে এখনই স্থানীয় সরবরাহের বিকল্প চ্যানেল বা সরবরাহ লাইন তৈরি করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে গ্যাস খাত।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেশের গ্যাস সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। অথচ প্রতিবছরই গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। উৎপাদন ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করতে হলে প্রতি বছর অন্তত ১০টি করে নতুন গ্যাসকূপ খনন করতে হবে। এরপরও ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র ও আমদানি করা এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মিলিয়ে গড়ে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ মোট সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলএনজির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। তবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় আগামী বছরগুলোতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এর অন্যতম কারণ, আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ নেই।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকায় ২০২৯-৩০ অর্থবছরে সরবরাহ দাঁড়াবে ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। তবে সে সময় চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৫ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। চাহিদা ও সরবরাহের এ ঘাটতি জ্বালানি খাত তথা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। তাই সরকারকে জ্বালানি খাতের জন্য দ্রুত ও কার্যকরী কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে।